ঢাকা, মঙ্গলবার ২৭ জুন ২০১৭  ,
২০:২৯:১৫ জানুয়ারি  ১১, ২০১৭ - বিভাগ: উপ-সম্পাদকীয়


ভূমিকম্প মোকাবেলায় ঢাকা থেকে রাজধানী স্থানান্তর করতে হবে

আকরাম খান
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট


১৬১০ খ্রিষ্টাব্দে সুবেদার ইসলাম খাঁ সর্বপ্রথম ঢাকায় রাজধানী স্থাপন করেন। বুড়িগঙ্গা নদীর উত্তর পাড়ে ঢাকা শহরের গোড়াপত্তন হলেও আড়াইশত বছর পর ১৮৬৪ খ্রিষ্টাব্দে বৃটিশ শাসনামলে ঢাকা পৌরসভায় রূপান্তরিত হয়। ১৯০৫ সালে বাংলাকে দুইটি প্রদেশে বিভক্ত করায় একবার এবং ভারতবর্ষের স্বাধীনতা লগ্নে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশ পূর্ববাংলায় ১৯৪৭ সালে আরও একবার ঢাকা প্রাদেশিক রাজধানীতে পরিণত হয়। ১৯৭২ সালে সেটি স্বাধীন দেশের পূর্ণাঙ্গ রাজধানী হিসাবে যাত্রা শুরু করে। বর্ণনা সংক্ষেপ হলেও বিষ্মিত হওয়ার মত বাস্তবতা এই যে মাত্র অর্ধ শতাব্দীরও কম সময়ের মধ্যে সেটি বিশ্বের অন্যতম জনবহুল ব্যাস্ত নগরীতে পরিণত হয়েছে।
আমরা জানি পৃথিবী নামে আমাদের এই গ্রহটির শিলাখন্ড একক (ঝড়ষরফ) নয়। মাটি বালি পাথর এবং অন্যান্য ধাতুর সমন্বয়ে গঠিত আমাদের ভূ-ভাগ একাধিক প্লেটে বিভক্ত। অবিরাম আহ্নিক গতি ও বার্ষিক গতির ফলে প্লেটগুলির সরণ এবং আন্দোলনে ভূমিকম্পের উদ্ভব হওয়া স্বাভাবিক। দূর অতীতে এ ধরনের ভূমিকম্পের ফলে সাগর পাহাড় এমন কি আবহাওয়ারও ব্যাপক পরির্তন হয়েছে পৃথিবীতে। স্থানান্তরিত হয়েছে মানুষের সহনশীল আবাস। জীব বৈচিত্রের হয়েছে ব্যাপক রদবদল। বিলুপ্ত হয়েছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। আবার নতুন মাত্রায় যুক্ত হয়েছে পৃথিবীর রূপ-রস-গন্ধ। প্রাণ এর চেতনা আপন গতিতেই খুঁজে পেয়েছে দেহের আকৃতি। অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা বাদ দিলেও সাধারণ ভূমিকম্প নগর সভ্যতার প্রলয়ঙ্করী শত্র“ সন্দেহ নাই। দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার ভূমন্ডলীয় একাধিক প্লেটের সংযোগস্থল কেবল বাংলাদেশ নয় রাজধানী ঢাকা থেকেও খুব বেশী দূরে নয়। বাংলাদেশ-মায়ানমার সীমান্তের ফল্ট লাইনে ইন্দো-অস্ট্রেলিয়ান প্লেট ও ইউরো-এশিয়ান প্লেটের অবস্থান। এ ছাড়াও গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম এর মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী দেশের অভ্যন্তরে সিলেটের ডাউকি ফল্ট, মধুপুর ফল্ট, সীতাকুন্ডের মায়ানমার ফল্ট ও আসাম-সিলেট ফল্ট সক্রিয় আছে। বাংলাদেশ ভূখন্ড ইন্ডিয়ান প্লেটে অবস্থিত হলেও বছরে ৪ সেঃ মিঃ গতিতে এবং ইন্ডিয়ান প্লেট ৬ সেঃ মিঃ গতিতে উত্তর-পূর্ব দিকে অগ্রসর হয়ে উত্তর প্লেটে বাঁধাপ্রাপ্ত হওয়ায় সেখানে ক্রমাগত প্রচুর শক্তি সঞ্চিত হয়ে চলেছে। ভূ-চ্যুতি রেখা বরাবর ঢাকা-সিলেট এর মধ্যবর্তী স্থান হওয়ার ফলে সেটিও ক্রমান্বয়ে সঙ্কুচিত হচ্ছে। সম্প্রতি কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির গবেষণা বিষয়ক জিওসায়েন্স সিএনএনকে দেওয়া এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, বাংলাদেশ-ভারত-মিয়ানমারের সংযোগস্থলের ভূ-গর্ভে বিশাল ফাটলের সন্ধান পাওয়া গেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী ড. স্টেকলারের নেতৃত্বে একদল গবেষক এই তথ্য জানিয়েছেন। এর ফলে বাংলাদেশ সহ আশেপাশের এলাকায় ৮ থেকে ৯ মাত্রার ভূমিকম্প যে কোন সময়ে আঘাত হানতে পারে। এই ফাটল থেকে বিজ্ঞানীরা সুনামির আশঙ্কাও উড়িয়ে দেন নাই। গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, এমনটি হলে সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্থ হবে বাংলাদেশ এবং ঢাকা মহানগরী।
১১৮৫ খ্রিষ্টাব্দে সর্বশেষ ঢাকায় বড় মাত্রার ভূমিকম্পের ইতিহাস আছে। যার মাত্রা রিখটার স্কেলে ৭ মাত্রার বেশী ছিল। ঢাকার পার্শ্ববর্তী সাভার ও মধুপুর এলাকার টিলার উৎপত্তি সেই ভূমিকম্পের ফসল বলে ধারণা করা হয়। সিলেট অঞ্চলের মাটির পাহাড়গুলি পোড়ামাটির সভ্যতার যুগে সৃষ্ট এতে কোন সন্দেহ নাই। নিকট অতীতে ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দে ৭ মাত্রার ভূমিকম্পে যমুনা নদীর গতিপথ পরিবর্তন হয়ে যায়। পৃথিবীর আহ্নিক গতির প্রভাবে ভূগর্ভস্থ পরিবেশের পরিবর্তন একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। বিশেষ করে প্রস্তরস্তরের উপরিভাগে এটি একটি সহজ সম্ভাবনা। কাজেই নিকট ভবিষ্যতে মাঝারী থেকে অতিমাত্রার ভূমিকম্প কেবল ঢাকা নয় পৃথিবীর বিভিন্ন অংশেই আঘাত হানতে পারে। আতঙ্কিত হওয়ার বিষয় যেটি তাহলো রাজধানী ঢাকা শহরে ৭ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানলে ৮৫ শতাংশ স্থাপনা সম্পূর্ণ ধ্বংশ হয়ে যেতে পারে। প্রাণহানির আশঙ্কা কমপক্ষে ৬০ শতাংশ। সবচেয়ে বড় কথা, এমনটি হলে ঢাকার রাস্তা পরিস্কার করতে সময় লাগবে ৩ বছর, উদ্ধার কাজ শুরু করতে ব্যয় হবে কমপক্ষে ১২০ দিন সময়। এমনকি প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং উদ্ধারকারী যন্ত্রপাতিও ধ্বংসস্তুপের মধ্যে চাপা পড়ে যাবে, যে কারণে দেখা দেবে বিশৃঙ্খলা। আধুনিক সভ্যতার স্বর্ণযুগেও ভূমিকম্পে ধ্বংসপ্রাপ্ত পরিত্যক্ত ঢাকা মহানগরী দেখতে হতে পারে আমাদের। সহস াব্দের উন্নয়ন ভাবনার পরিবর্তে সহস াব্দ পিছন থেকে আবার যাত্রা শুরু করতে হতে পারে। আমরা তা চাই না। ইতোমধ্যে দেশের অভিজ্ঞ প্রকৌশলীদের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, রাজধানী ঢাকার ৯৫% স্থাপনাই ত্র“টিপূর্ণ। বিল্ডিং কোড দূরের কথা, মালিকের ইচ্ছা ও পরিকল্পনায় রাজমিস্ত্রিদের পরামর্শে এই মহানগরীর অধিকাংশ বহুতল ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। এমন কি টিনশেড এর উপযোগী দেয়ালের উপর তিনতলা ভবন, তিন তলার উপর নয় তলা ভবন নির্মাণ করেছেন অতিলোভী ও অবৈধভাবে অর্থবিত্তের মালিক হওয়া দখলদার ব্যাক্তিগণ। ঢাকা মুখি জনসে াত অস্বাভাবিক ভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় একদিকে আবাসিক সংকটের চাহিদা পূরণ, অন্যদিকে কর্মমুখি জনসে াতকে কাজে লাগাতে লাভজনক ব্যবসাবাণিজ্য ও কলকারখানা গড়ে তুলতে মালিক মহাজনরা আগ্রহী হয়ে উঠেছে। ঢাকার আয়তন বেড়েছে রাতারাতি, ভারী স্থাপনা নির্মিত হয়েছে যত্রতত্র মাটির বহন ক্ষমতা পরীক্ষা করা ছাড়াই। শুধু খাল বিল, পুকুর ডোবাই নয়, রাজধানীর বর্জ্য ফেলা হয় যে সব স্থানে নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ ও মালিকদের যোগসাজসে তার উপরও গড়ে উঠেছে বিশাল আকৃতির বহুতল ভবন ও কারখানা। সংস্কারবিহীন পুরান ঢাকা আর নির্মাণ ত্র“টির নতুন ঢাকার ৯৫% দালানকোঠা এখন মহা-বিপর্যয়ের সীমান্ত রেখায় অবস্থান করছে। এই সব স্থাপনা ঘিরে জালের মত ছড়িয়ে আছে গ্যাস সরবরাহের পাইপ লাইন। বড় ধরণের বিপর্যয়ে গ্যাস লাইনে বিস্ফোরণ ঘটলে সেটি কেমন ভয়াবহ হবে ভাবাই যায় না। কাজেই আমরা মনে করি ঢাকাকে বাসযোগ্য এবং রক্ষা করতে হলে দেশের প্রশাসনিক রাজধানী স্থানান্তর করার সিদ্ধান্ত অবিলম্বে গ্রহণ করা উচিৎ। অবিলম্বে রাজধানী স্থানান্তর এর ঘোষণা দেওয়া হলে অনেকগুলি সুফল পাওয়া যেতে পারে। এক. ঢাকামুখি জনস্রোত থম্কে যাবে। দুই. ঢাকার পরিধি না বাড়িয়েই ঢাকাকে আধুনিক নগরীতে পরিণত করা সহজ হবে। তিন. যানজট নিরসনের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হবে। চার. বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও শিল্প কলকারখানার অসহনীয় চাপ হ্রাস পাবে। পাঁচ. প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় পর্যাপ্ত প্রস্তুতি গ্রহণের সুযোগ পাওয়া যাবে। ছয়. যে কোন পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রশাসনিক ও কারিগরি সহায়তা প্রদানের প্রতিবন্ধকতা দূর হবে। সাত. ঢাকার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের কোন ক্ষতি হবে না। আমাদের প্রতিবেশী অধিকাংশ দেশের রাজধানী ইতোমধ্যে স্থানান্তরিত করা হয়েছে। ভারতের নয়াদিল্লী, পাকিস্তানের ইসলামাবাদ, মালয়েশিয়ার পুত্রজায়া, মিয়ানমারের নেপিদহ,  গনচীনের বেইজিং, ব্রাজিলের ব্রাজিলিয়া, উত্তর কোরিয়ার পিয়ংইয়ং ইত্যাদি সবই স্থানান্তরিত রাজধানী। রাজধানীর অজুহাতে একটিমাত্র শহরকে জগাখিচুরী করে সৌন্দর্য, নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্যের পরিপন্থী করে রাখা সমীচিন নয়। রাষ্ট্রের নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগ এক্ষেত্রে বাধাগ্রস্থ হয়। আইন প্রণয়ন ও প্রশাসন পরিচালনার জন্য সুস্থ পরিবেশ থাকা দরকার। এতসব যুক্তি উপাত্ত এবং গবেষণা ছাড়াও সময় আর প্রগতি-প্রকৃতির নিরিখে বলা যায়, আজ হোক কাল হোক বাংলাদেশের রাজধানী স্থানান্তর  করা ছাড়া অন্য কোন বিকল্প থাকবে না।
ভূমিকম্পের ফলে এই মহানগরী যদি ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়, সেদিন কে কার কাছে বিচার চাইবে সেটাই এখন প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। দন্ডদাতা, দন্ডিত এবং দন্ডপ্রার্থীর মহাশূন্যতা সেদিনের জন্য যেন অপেক্ষা না করে। ঢাকাকে রক্ষা করতে হলে এখন থেকেই সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা দরকার। সেজন্য সহজ ও কার্যকর পথ একটি। তাহলো রাজধানী স্থানান্তর করে ঢাকার শিল্পাঞ্চল, বাণিজ্যিক এলাকা ও আবাসিক এলাকার সীমানা চিহ্নিত করে কঠোর ভাবে সেটি নিয়ন্ত্রণ করা। আমরা মনে করি, জোর করে ঢাকা থেকে একটি মানুষ অথবা যত অবৈধই হোক না কেন, কোন স্থাপনা ঢাকার বাইরে স্থানান্তর করা যাবে না। যেখানে যেটুকু যেভাবে আছে, আপাতত সেটুকু সেই পর্যন্ত সীমাবদ্ধ রাখাই প্রধান কাজ। তাহলে ধীরে হলেও সেগুলির সংস্কার কাজ আর স্বেচ্ছায় ঢাকা ত্যাগের মানসিকতা অনেকের মধ্যেই জাগ্রত হতে পারে। ভবিষ্যতে ঢাকাকে পরিত্যক্ত নগরী ঘোষণা করার প্রয়োজন দেখা দেওয়ার আগেই সংশ্লিষ্ট সকলকে এটিকে গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে।


উপ-সম্পাদকীয়'র অন্যান্য খবর

©সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি