ঢাকা, বৃহস্পতিবার ২৫ মে ২০১৭  ,
২০:৩০:২০ জানুয়ারি  ১১, ২০১৭ - বিভাগ: উপ-সম্পাদকীয়


বাল্যবিয়ে বন্ধে সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন

মো. ওসমান গনি
হামিদা আক্তার


লেখকদ্বয়: কলামিস্ট

দুর্ভাগ্যজনকভাবে শিশু বিবাহের ভয়াবহতার চিত্রে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে চতুর্থ। দেশের ২০-২৪ বছর বয়সী বিবাহিত নারীদের মধ্যে ৬৪% মহিলার  বিয়ে হয় ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে (ইউনিসেফ-২০১২)। এখনো আমাদের দেশে এক-তৃতীয়াংশ মেয়ের ১৫ বছরের পূর্বে এবং দুই-তৃতীয়াংশ মেয়ের ১৮ বছরের পূর্বে বিয়ে হয়



বাল্যবিয়ে আমাদের সমাজের জন্য একটি মারাÍক ব্যাধি। এ ব্যাধি দূর করার জন্য সরকারি ও বেসরকারিভাবে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালানো হলেও তা কোনোভাবে রোধ করা যাচ্ছে না। যে  কোনো মূল্যে এ ব্যাধি আমাদের সমাজ থেকে রোধ করতে হবে। তা না হলে একদিন আমাদের এ ভুলের জন্য খেসারত দিতে হবে। অপ্রাপ্ত বয়স্ক ছেলে ও মেয়ের বিয়ের কারণে আমাদের সংসার জীবনে সব সময় ঝগড়া ও কলহ লেগেই থাকে। কারণ অপ্রাপ্ত বয়স্ক ছেলে ও মেয়েরা সংসার ধর্ম বোঝে না। এতে করে পুরো পরিবারে নেমে আসে অশান্তি। আমাদের দেশে মোট জনসংখ্যার শতকরা ২১ জনের বাল্যবিয়ে হয়। এসব বাল্যবিয়ে বন্ধ করতে পারলে আমাদের দেশের শ্রমবাজারে ৩ কোটিরও বেশি দক্ষ জনশক্তি সংযুক্ত করা যাবে। আর বাল্যবিয়ের হার শুন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে পারলে ৭৫.৫% মেয়েকে স্কুলের লেখা-পড়া ছাড়তে হবে না। ১৮ বছরের পূর্বে একটি শিশু মা হওয়ার কারণে মা ও শিশু মৃত্যুর ঝুঁকি বেশি থাকে। আর এ মৃত্যুর ঝুঁকি কমাতে  আমাদের দেশে প্রতি বছর এ খাতে  প্রায় ১৪ কোটি টাকা ব্যয় হয়, যা জিডিপি’র প্রায় ২.৫ ভাগ। বাল্যবিয়ে রোধ করতে পারলে এ খরচ ৫০% কমানো সম্ভব।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে শিশু বিবাহের ভয়াবহতার চিত্রে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে চতুর্থ। দেশের ২০-২৪ বছর বয়সী বিবাহিত নারীদের মধ্যে ৬৪% মহিলার  বিয়ে হয় ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে (ইউনিসেফ-২০১২)। এখনো আমাদের দেশে এক-তৃতীয়াংশ মেয়ের ১৫ বছরের পূর্বে এবং দুই-তৃতীয়াংশ মেয়ের ১৮ বছরের পূর্বে বিয়ে হয়। যার মাত্রা গ্রামাঞ্চলে বেশি। দেশের গ্রামাঞ্চলে ৭১% এবং শহরে ৫৪% মেয়ের বিয়ে হয় উল্লেখিত সময়ের আগে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর বাল্যবিয়ে বন্ধের লক্ষ্যে পূর্বের আইনটি পরিবর্তনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন, যা বর্তমানে খসড়া আকারে মন্ত্রিসভার অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। যদিও আইনটি বাস্তবায়ন হলে বাল্যবিয়ের হার শুন্যের কোঠায় নেমে আসবে না, তথাপি মাঠ পর্যায়ে প্রতিরোধ কার্যক্রমগুলো আরো শক্তিশালী হবার একটি জোরালো ভিত রচিত হবে।
বাল্যবিয়ের মূল কারণ অশিক্ষা। বাংলাদেশের এমনও অঞ্চল রয়েছে যেখানে এখনও পুরোপুরি শিক্ষার আলো পৌঁছেনি। আমাদের দেশে এমন কিছু অভিভাবক রয়েছেন যারা মনে করেন মেয়েদেরকে বেশি লেখাপড়া করিয়ে লাভ নেই। তারা পরের বাড়িতে চলে যাবে। তাদেরকে বিয়ে দিয়ে দিতে পারলেই যেন তারা মুক্ত হয়। পারিবারিকভাবে নির্যাতনের শিকার নারীদের প্রায় ৩৩% নিরক্ষর, আর ৩৩% এর  রয়েছে শুধু প্রাথমিক শিক্ষা। অথচ শিক্ষিত একজন  মেয়ে তার দায়িত্ব ও অধিকার সম্পর্কে যেমন বেশি সচেতন হয়, ঠিক তেমনি তার সন্তানের প্রতিও সচেতন হয়। একজন শিক্ষিত মেয়ে তার সন্তানকে শিক্ষিত করে গড়ে তোলার জন্য কঠোর পরিশ্রম করেন রাত-দিন। একজন শিক্ষিত মায়ের সন্তানের ভবিষ্যৎ জীবন উজ্জ্বল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে বেশি। যে সংসারের মা শিক্ষিত সে সংসারের ছেলে বা মেয়েরা কখনও অশিক্ষিত হতে পারে না এবং সে সংসারে কখনও বাল্যবিয়ে হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না। তাই দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিশুদের বিশেষ করে কন্যাশিশুদের বিদ্যালয়ে উপস্থিতি বাড়ানো ও উন্নত শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে শিক্ষকদের সম্পৃক্ত করতে হবে। শিক্ষকরা তাদের বাড়ি পরিদর্শন করে বিদ্যালয়ে উপস্থিতি নিশ্চিত করতে পারেন। বিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং ব্যবস্থাপনা কমিটির উদ্যোগে স্বামী পরিত্যক্ত, তালাকপ্রাপ্ত এবং বিবাহিত নারীদের স্কুলে আসতে উৎসাহিত করা হলে ঝরে পড়া অনেকাংশে কমে যাবে।
মেয়েদের জন্য সরকার øাতক পর্যন্ত শিক্ষা অবৈতনিক করলেও বাস্তবে তা কাজে আসছে না। দেশে বাল্যবিয়ে বন্ধ করতে না পারলে মেয়েদের কখনও উচ্চ শিক্ষাগ্রহণ করা সম্ভব হবে না। তাছাড়া আমাদের দেশের অভিভাবকদের মনমানসিকতা পাল্টাতে হবে। অনেক অভিভাবক নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে ১৮ বছরের আগেই মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দেন। যৌন হয়রানি প্রতিরোধে হাইকোর্টের যুগান্তকারী রায় (১৪ মে’২০১৪) অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষ জানেন না। এমনকি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি নির্মূল কমিটিও নেই।
আমাদের দেশে সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার কারণে অনেক মা-বাবা তাদের অল্প বয়সী মেয়েদের বিয়ে দেন। কারণ এসব অভিভাবকরা মনে করেন, এ সমাজে মেয়েদের কোনো নিরাপত্তা নেই। তাদের মেয়ে শিশুরা নিজের পরিবারে, স্কুলে, চলার পথে, বাজারে সর্বত্রই শারীরিক ও যৌন হয়রানির শিকার হতে পারে হরহামেশাই। কিন্তু বিয়ের পর ঘটে এর বিপরীত। মা-বাবা মেয়ের সুখ-শান্তির আশায় অল্প বয়সে মেয়ের বিয়ে দিয়ে পাঠিয়ে দেন স্বামীর ঘরে। সেখানে তার ওপর শুরু হয় পারিবারিক নির্যাতন। এর মূল কারণ হলো, স্বামীর ঘর-সংসার ঠিক মতো করতে না পারা। যে বয়সে তার বিয়ে হলো সে বয়সে সে তার নিজের দেহের গঠন সম্পর্কে ভাল করে জানে না। তার প্রজনন শিক্ষার অভাব, সিন্ধান্ত গ্রহণের অক্ষমতা, অধিকার ও কর্তব্য সম্পর্কে জ্ঞানের অভাব তাকে আরও ভয়ংকর পরিণতির দিকে ঠেলে দেয়। ফলে পারিবারিক নির্যাতন, যৌতুকের দাবি, স্বামীর নিখোঁজ হয়ে যাওয়া, এমনকি তালাকের মত ঘটনা প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ কারণে গ্রামাঞ্চলে ও শহরের বস্তিগুলোতে স্বামী পরিত্যক্ত মায়ের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। অথচ বয়ঃসন্ধিক্ষণের সময় পার হওয়ার আগেই গ্রামের লোকজন শিশুকন্যাকে বিয়ের দেওয়ার জন্য বিভিন্ন কৌশলে চাপ দিতে থাকেন অভিভাবকদের। অনেক সময় তাদের কথামতো বিয়ে না দিলে তারা শিশুকন্যার বাবা-মাকে এক ঘরে করে রাখার ভয়ভীতিও প্রদর্শন করেন। তখন কোনো উপয়ান্তর খুঁজে না পেয়ে অভিভাবকরা শিশুকন্যার বিয়ে দিয়ে দেয় এসব চাপ থেকে নিজেদেরকে বাঁচাতে।
বাল্যবিয়ের কারণে কিশোরী বধূর শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য হুমকির মধ্যে পড়ে। কিশোরী মা মৃত্যু ঝুঁকিতে থাকে। সেই অপুষ্ট মা যে শিশুর জš§ দেয়, সেও থাকে মৃত্যুর ঝুঁকিতে। সুতরাং বাল্যবিয়ের শিকার মেয়েটির পুরো জীবনই ঝুঁকির মধ্যে চলে যায়। আমাদের দেশের কন্যাশিশুদের প্রায় ৩৫-৫০% অপুষ্টির শিকার। বিয়ের পর পরই স্বামী ও পরিবারের অন্যরা সন্তানের মুখ দেখতে চায়। এক বা দুই বছরের মধ্যে সন্তান পেটে না এলে স্বামী যদি বংশরক্ষার জন্য আবার বিয়ে করে ফেলে এই ভয়ে অনিচ্ছা সত্ত্বেও কিশোরী মেয়েটি অপুষ্ট অবস্থায় কম ওজনের সন্তান জš§ দেয়। অনেক সময় নবজাতক ও মায়ের অসুখ লেগেই থাকে। পরবর্তীতে এই অপুষ্ট মা ও শিশু পরিবার এবং জাতির বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। অনেক ক্ষেত্রে মেয়েরাও ভবিষৎ জীবনের পরিণতি না ভেবে বিয়েতে সম্মতি দেয়। নিজেদের ওপর আস্থা এবং বিবাহত্তোর পরিণতি সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণার অভাবে শিশু মেয়েরা অনিশ্চিত জীবনে পা রাখে বিয়ের মাধ্যমে। বাল্যবিবাহ আইন সম্পর্কে স্থানীয় প্রশাসন, আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, ইউনিয়ন পরিষদের জনপ্রতিনিধি, বিবাহ রেজিষ্ট্রারদের অবহিতকরণ ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। ১৯৬১ সালে মুসলিম পারিবারিক আইন প্রবর্তিত হয়েছে। এর সঠিক প্রয়োগেও বাল্যবিয়ে রোধ করা সম্ভব। বিবাহ বিচ্ছেদ আইনের কড়াকড়ি ভাবে প্রয়োগ করা গেলে কিছুটা হলেও বাল্যবিয়ে রোধ হবে। 
বাল্যবিয়ে বন্ধে আমাদের সমাজের সকল পেশা-শ্রেণির মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে। বাল্যবিয়ের কুফল সম্পর্কে দেশের প্রতিটি এলাকায় সভাসমাবেশ করে দেশবাসীকে জানিয়ে দিতে হবে। দেশের প্রতিটি এলাকার সচেতন ব্যক্তিগণকে বাল্যবিয়ে বন্ধে জোরালো ভূমিকা রাখতে হবে। বাল্যবিয়ের কুফল সম্পর্কে বিভিন্ন গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালাতে হবে। স্থানীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে বাল্যবিয়ের খবর পেলে সাথে সাথে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।


উপ-সম্পাদকীয়'র অন্যান্য খবর

©সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি