ঢাকা, বুধবার ১৩ ডিসেম্বর ২০১৭  ,
১৯:১৭:৪৪ ফেব্রুয়ারি  ১৭, ২০১৭ - বিভাগ: উপ-সম্পাদকীয়


দিবানিশি কাঁদে নদী দখল দূষণে

Image

ফারিহা হোসেন প্রভা


ঔপন্যাসিক সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ বহু আগেই লিখেছেন ‘কাঁদো নদী কাঁদো’ নামের কালজয়ী উপন্যাস। আমাদের নদীগুলোকে মানুষ নির্বিচারে গলাটিপে হত্যা করছে। তাই ডুকরে ডুকরে কাঁদছে আমাদের নদ-নদীগুলো। বালু ব্যবসায়ী, বিভিন্ন হাউজিং কোম্পানি, শিল্প-মালিকসহ স্বার্থান্বেষীমহল দেশের নদীগুলোকে গলাটিপে হত্যা করছে। বাস্তবতার নিরিখে শুধু নদী নয়, একই সাথে নদী পথও রক্ষায় উদ্যোগী হতে হবে। কারণ নদীকেন্দ্রিক জীবন, ব্যবসা, যাতায়াত, কৃষি, সংস্কৃতি তথা আমাদের সামগ্রিক জীবনধারাকে রক্ষা করতে হলে নদীকে বাঁচাতে হবে। এই শুভবোধ যত তাড়াতাড়ি আমাদের মধ্যে জেগে উঠবে দেশ ও জাতির জন্য তা ততই মঙ্গল। পানি ছাড়া প্রাণের অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না। তেমনি আমাদের সভ্যতা, কৃষি ব্যবস্থা এবং যোগাযোগ ও পণ্য পরিবহনের মৌলিক মাধ্যমই হচ্ছে নদী। বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক দেশ। শাখা-প্রশাখাসহ প্রায় ৮০০ নদ-নদী বিপুল জলরাশি নিয়ে ২৪ হাজার ১৪০ কিলোমিটার জায়গাজুড়ে জালের মতো জড়িয়ে আছে। দেশের অধিকাংশ এলাকায় নদ-নদীর মাধ্যমে বয়ে আসা পলিমাটি জমে তৈরি হয়েছে সমৃদ্ধ দেশ। দেশের নদীর সংখ্যা এখন ৪০৫টি। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ১০২টি, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে ১১৫টি, উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ৮৭টি, উত্তর কেন্দ্রীয় অঞ্চলে ৬১টি, পূর্ব-পাহাড়ি অঞ্চলে ১৬টি এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে ২৪টি।
দুঃখজনক হলেও সত্য, অধিকাংশ নদ-নদী বর্তমানে দখল-দূষণে মৃত প্রায়। নিরন্তর চলছে নদ-নদী হত্যার মহাযজ্ঞ। ফলে নদীকেন্দ্রিক জীবন-জীবিকা ও সংস্কৃতি হারিয়ে যাচ্ছে এবং বিলুপ্তির পথে জলজসম্পদ। দেশের পত্রিকায় প্রতিনিয়ত নদী দখল ও দূষণের খবর প্রকাশিত হয়। বাংলাদেশের নদ-নদীগুলো কত অসহায় এবং কতটা দুর্দশার মধ্যে রয়েছে তা সহজেই অনুমেয়। গত পাঁচ বছরে বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, তুরাগ ও বালু নদে ড্রেজার মেশিন ব্যবহার করা হয়নি। ফলে এসব নদ-নদীর তলদেশ খনন এবং বর্জ্য অপসারণ করা সম্ভব হচ্ছে না। দুটি নদীতে এক্সক্যাভেটর মেশিন দিয়ে শুধু তীরের খননকাজ করা হচ্ছে। রাজধানীর চারপাশের নদীগুলো দখল-দূষণে আজ মৃতপ্রায়। ট্যানারি বর্জ্য, শিল্প-কলকারখানার বর্জ্য, হাসপাতালের বর্জ্য, গৃহস্থালিত বর্জ্যসহ নানা ধরনের বর্জ্যÑ এসব নদ-নদীর তলদেশ ভরাট করে ফেলেছে। নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ করা না হলে এসব নদ-নদীর অবশিষ্টাংশও রক্ষা করা যাবে না। কিন্তু গত পাঁচ বছর ধরে ড্রেজিং করা হয়নি, আবার বর্জ্য ফেলাও বন্ধ করা হয়নি। তলদেশ খনন আর বর্জ্য অপসারণের কাজ করা দরকার নিয়মিত।
পানির অভাবে দেশের অধিকাংশ নদ-নদী মরে যাচ্ছে। বর্ষায় নদীগুলোতে পলি জমে ভরাট হচ্ছে। নাব্য হারানোর ফলে দেখা দেয় বন্যা। শুষ্ক মৌসুমে অধিকাংশ নদ-নদী শুকিয়ে যাওয়ার ফলে ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষি, মৎস্যসম্পদ, নৌপরিবহন ও আবহাওয়া-পরিবেশের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। অথচ মানুষের বেঁচে থাকার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এদেশের নদ-নদীর সাথে জড়িত দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন। সাধারণত প্রাকৃতিক দুটি উৎস থেকে পানি পেয়ে থাকে দেশের মানুষ। এর একটি হলো নদ-নদী, খাল-বিল, হাওর-বাঁওড় ও পুকুরের পানি। অন্যটি হলো ভূগর্ভস্থ পানি। প্রথমটির ওপর দ্বিতীয়টি সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল। আবহমানকাল থেকেই এদেশের মানুষের জীবন-জীবিকা নদীনির্ভর। সভ্যতা, সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রার অন্যতম নিয়ামকও হলো নদী। এই গুরুত্ব অনুধাবন করে সরকার নানামুখী পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে দেরিতে হলেও। এটা সুখের খবর।
আমাদের মনে রাখা দরকার, বঙ্গোপসাগরের জোয়ার-ভাটার টানে সাগর থেকে আসে লোনাপানি। এই লোনাপানিকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে আসা প্রতিরোধ করে উজান থেকে আসা নদ-নদীগুলোর মিঠা পানির প্রবাহ বাড়াতে হবে। দেশের প্রায় সব নদ-নদীর পানির পানিপ্রবাহের মূল উৎস সীমান্ত নদী। বর্ষায় উজান থেকে নেমে আসা আকস্মিক পাহাড়ি ঢলে তলিয়ে যায় গ্রামগঞ্জ, ক্ষেতের ফসল প্রভৃতি। আবার ফারাক্কা বাঁধের প্রভাবে ও শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গা অববাহিকার নদ-নদী খাল-বিলগুলো শুকিয়ে যায়। তখন প্রবাহশূন্য হয়ে পড়ে মহানন্দা, গড়াই, মাথাভাঙ্গা, বেতনা, ভৈরব, কপোতাক্ষ, ইছামতির মতো বড় বড় নদীগুলো। মিঠাপানির অভাবে হুমকিতে পড়েছে সুন্দরবন। লবণাক্ততা মারাÍকভাবে বেড়ে যাওয়ায় ক্ষতির মুখে সুন্দরবনসহ দেশের উপকূলীয় অঞ্চল। শুষ্ক মৌসুমে চীন ও ভারত অসংখ্য পাম্প বসিয়ে এই নদীর পানি টেনে নেয়। ফলে শুষ্ক মৌসুমে পানিপ্রবাহ কমে আসে ব্রহ্মপুত্র ও যমুনাতে। কাপ্তাই লেকের পানি কমতে থাকায় ও অবৈধ দখলের কারণে হুমকিতে পড়েছে কর্ণফুলী। এসব নদীর উজানে বাঁধের কারণে বিপর্যয় নেমে আসে ভাটি অঞ্চলে। অবশ্য নদী বাঁচাতে কিছু কিছু নদী খননের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এর মধ্যে রয়েছে কুষ্টিয়ার গড়াই নদী। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পানির প্রবাহ না থাকলে কোনো নদীই খননের মাধ্যমে রক্ষা করা সম্ভব নয়। দেশকে বাঁচাতে হলে খননের পাশাপাশি, প্রতিবেশী দেশ থেকে পানির ন্যায্য হিস্যা আদায় করার উদ্যোগ নিতে হবে। নদীর প্রবাহ ঠিক রাখতে এবং দেশকে বিপর্যয় থেকে রক্ষায় পানি পাওয়ার নিশ্চয়তা বিধান জরুরি। পলি জমে কমপক্ষে ৯৫টি নদী বিলুপ্তির অপেক্ষায় ধুঁকছে। নদী দখলের সাথে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করা বাঞ্ছনীয়। সেই সাথে ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তা দ্রুত করা দরকার। আমাদের মতো অনুন্নত ও কৃষিপ্রধান দেশের জন্য নদীই হচ্ছে আমাদের প্রাণপ্রবাহ।
এই প্রাণপ্রবাহ যে কোনো মূল্যে রক্ষা করতে হবে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে নদীর গুরুত্ব বাড়ছে। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার কারণে আবাসন ও শিল্পায়নের প্রয়োজনে কর্ষণযোগ্য ভূমি সংকুচিত হয়ে পড়ছে। পাহাড় কেটে নদীর বুকে ফেলা হচ্ছে মাটি। সেই মাটির কারণে ভরাট হচ্ছে নদী। একসময় নদীর অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাচ্ছে পাহাড় আর সমতলের মানুষের অত্যাচারের কারণে। এভাবে বিলীন হয়ে গেছে দেশের ১৭টি নদী। এর বাইরে শুধু ঢাকা শহরেরই ১৮টি নদীর চিহ্নও এখন খুঁজে পাওয়া যাবে না। শুধু বুড়িগঙ্গা নদীর বুকেই নাকি ১০ ফুট পুরু পলিথিনের স্তর জমেছে। এই তথ্য উদ্বেগজনক। ঢাকার হাজারীবাগ ট্যানারি থেকে যে বর্জ্য পড়ছে বুড়িগঙ্গায়, সেই বর্জ্য ধারণ করার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেছে এই নদী। নদীর যদি মুখ থাকত, তা হলে তার পক্ষে বলা সম্ভব হতো মানুষের হাতে সে কতটা নির্যাতিত হচ্ছে। এখনই উপযুক্ত সময় নদীগুলোকে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করতে উদ্যোগী হওয়া।
সম্প্রতি পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে রাজধানীর পাশের পাঁচ নদীর করুণ অবস্থার কথা উঠে এসেছে। বাস্তবে প্রায় প্রতিটি নদীই আজ বিপন্ন। দখল, দূষণ, ভরাটসহ অপরিকল্পিত উন্নয়ন উদ্যোগের কারণে এসব নদী স্বাভাবিকত্ব, ঐতিহ্য হারাচ্ছে, কমছে নাব্য। এমন অবস্থায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তার সরকারের নৌ পরিবহনমন্ত্রী, পানিসম্পদ মন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট মহলকে দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন নদীকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার সব কর্মকাণ্ড শুরু করার। তবেই নদীকেন্দ্রিক জীবন, অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, সংস্কৃতি, কৃষি, সভ্যতা রক্ষা পাবে। একই সাথে নদ-নদী ফিরে পাবে প্রাণপ্রবাহ। এক্ষেত্রে দখল-দূষণও ঠেকাতে হবে কঠোর হাতে।
লেখক: ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক


উপ-সম্পাদকীয়'র অন্যান্য খবর

©সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি