আধুনিক নগর হিসেবে ঢাকাকে গড়ে তুলতে হবে

0
12

সেলিম হোসেন :

আমাদের সবার প্রিয় শহর ঢাকা। বাংলাদেশের রাজধানী এবং বিশে^র অন্যতম মহানগর। ঢাকা মোঘল-পূর্ব যুগে কিছু গুরুত্ব ধারণ করলেও শহরটি প্রসিদ্ধি লাভ করে মোঘল শাসনামলেই। ১৬১০ খ্রিস্টাব্দে ইসলাম খান চিশতি বাংলার রাজধানী রাজমহল থেকে ঢাকায় স্থানান্তর করেন। ১৬৪০ খ্রিস্টাব্দে মানরিক ঢাকা শহর ও শহরতলির লোকসংখ্যা ২ লক্ষ বলে উল্লেখ করেন।

১৮৭২ সালে প্রথম আদমশুমারিতে ঢাকার জনসংখ্যা ছিল ৬৯,২১২ জন। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের পর জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেতে থাকে, ১৯৭৪ সালের মধ্যে তা বেড়ে গিয়ে দাঁড়ায় ১৬,৮০,০০০ জনে। ১৯৯১ সালে জনসংখা ছিল ৬১,৫০,০০০ জন। বর্তমানে ঢাকা শহরের জনসংখ্যা ২১ মিলিয়নেরও অধিক।

বাস্তব বা কাল্পনিক যাই হোক না কেন, নগরীর অভূতপূর্ব বিস্তার, চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং অন্যান্য সুযোগ সুবিধা সৃষ্টির ফলে দেশের সব স্থান হতে বিপুলসংখ্যক গ্রামের অধিবাসীকে ঢাকায় আসতে উদ্বুদ্ধ করে। বর্তমানে ঢাকা একটি সমৃদ্ধ ও ক্রমবর্ধমান নগরী, যেখানে ব্যাপকভাবে শিক্ষা, বাণিজ্যিক, শিল্পসংক্রান্ত, আর্থিক, খেলাধুলাবিষয়ক এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড সম্পাদিত হয়। মূলত ঢাকা থেকেই এসবের কার্যক্রম পরিকল্পনা করা হয়ে থাকে। রাজধানী শহর এবং দেশের প্রশাসনিক সদর দপ্তর হওয়াতে এটি রাজনৈতিক প্রাণকেন্দ্রও বটে।

বর্তমানে ঢাকায় দ্রুতগতির উন্নয়ন ও সম্প্রসারণের জোয়ার দেখা দিয়েছে। অবশ্য অপরিকল্পিত সম্প্রসারণের উপর কোনো সুষ্ঠু পরিকল্পনা এবং যথাযথ কর্তৃপক্ষের প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ নেই। দেশের সকল সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয়সহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ঢাকা শহরে হবার কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রতিদিন প্রায় ১০/১২ লক্ষ মানুষ এ মহানগরীতে প্রবেশ করে এবং বের হয়ে যায় তাদের নিজ নিজ এলাকায়। এবার মূল প্রসঙ্গে আসা যাক। ঢাকা শহরের আয়তন ৩৬০ বর্গ কিলোমিটার। আমি ঢাকা শহরের যানজট নিরসনের বাস্তবভিত্তিক তথ্য তুলে ধরতে চাই। গত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয়লাভ করে সরকার গঠন করে। ইতোমধ্যে সরকারের মেয়াদ দুই বছর পূর্ণ হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য সাফল্য এসেছে, জনগণ তা সানন্দচিত্তে গ্রহণ করেছে। পলিথিন উৎপাদন বিপণন নিষিদ্ধ হবার কারণে বাজারে পুনরায় এসেছে কাগজ ও পাটের তৈরি ব্যাগ। পরিবেশ দূষণকারী টু-স্ট্রোক থ্রি হুইলারের পরিবর্তে রাজপথে এসেছে পরিবেশ বান্ধব সিএনজিচালিত ফোর-স্ট্রোক থ্রি হুইলার। সেইসাথে পুরাতন বাসের পরিবর্তে এসেছে অনেক নতুন বাস ও বিআরটিসির দোতলা বাস।

মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের পরিবারবর্গের পুনর্বাসনের জন্য মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠন করা হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা দশ হাজার টাকায় উত্তীর্ণ করা হয়েছে। এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় নকলের মহোৎসব বন্ধ হয়েছে। শিশুদের সৃজনশীল মেধা বিকাশের জন্য চালু হয়েছে বঙ্গবন্ধু শিক্ষা বৃত্তি। গঠিত হয়েছে স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন। চাঞ্চল্যকর মামলা দ্রুত সমাপ্তিসহ অর্জিত হয়েছে আরও বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য সাফল্য। সাম্প্রতিককালে ভয়াবহ বন্যা ও অতিবর্ষণের ফলে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধি পেলেও বর্তমানে তা সহনীয় পর্যায়ে নেমে এসেছে। অন্য যে কোন সময়ের তুলনায় বর্তমানে রাজধানীসহ দেশের সামগ্রিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভাল। দস্যুদের অস্ত্র সমার্পণের ফলে পাহাড়, বন এবং বঙ্গোপসাগরে শান্তি বিরাজ করছে।

মহাকাশে স্থান পেয়েছে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১, রূপপুর পারমাণবিক কেন্দ্রের কাজ সমাপ্তির পথে। বঙ্গোপসাগরে মাথা উঁচু করে দাঁড়াচ্ছে তৃতীয় সমুদ্রবন্দর পায়রা। নিজস্ব অর্থায়নে স্বপ্নের পদ্মা সেতু দৃশ্যমান হওয়ায় বাংলাদেশ স্বনির্ভর ও সাহসী হিসেবে বিশের দরবারে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এত সাফল্যের পরেও শুধুমাত্র রাজধানীর যানজটের কারণে সরকারকে সমালোচনার মুখে পড়তে হচ্ছে প্রতিনিয়ত। আমি মনে করি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে সামনে এগোলে ঢাকা শহরকে অনেকাংশে যানজটমুক্ত করা যায়। প্রধানত দু’টি বিষয়ের দিকে দৃষ্টি দিলে যানজটমুক্ত ঢাকা শহর জনগণকে উপহার দেয়া সম্ভব।
এক. প্রশাসন বিশেষ করে পুলিশ প্রশাসনের কাজের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। দুই. যে সড়কগুলোতে বাস চলাচল করে সেই সড়কগুলোকে পর্যায়ক্রমে রিকশামুক্ত করার পাশাপাশি রিকশাচালকদের আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেয়া। প্রতিদিন রাজধানীর প্রধান সড়কগুলোর নিরাপত্তার দায়িত্বে বিপুল সংখ্যক পুলিশ ও আনসার বাহিনীর সদস্যগণ অক্লান্ত পরিশ্রম করে থাকেন। এখন থেকে তাদের কাজের পরিধি এবং জবাবদিহিতা আরও বৃদ্ধি করতে হবে। ভালো কাজের জন্য পুরস্কার এবং দায়িত্ব অবহেলার জন্য শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। ধরুন এক কিলোমিটার সড়কে আইন শৃঙ্খলা এবং সার্বিক নিরাপত্তার জন্য ৬ জন পুলিশ এবং তিনজন আনসার বাহিনীর সদস্য দায়িত্ব পালন করেন, তাদের নির্দেশনা দেওয়া থাকবে উক্ত এক কিলোমিটার সড়ক এবং সংশ্লিষ্ট ফুটপাতের মধ্যে কোনো যানবাহন, নির্মাণসামগ্রী, দোকানপাট বা রাজপথ দখল করে থাকে এরূপ কোন জিনিসপত্র থাকলে তা দ্রুত অপসারণের ব্যবস্থা করা না হলে প্রথমে মৌখিক এবং পরবর্তীতে আইনগতভাবে সেইসব ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা। এছাড়া আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করছে কিনা তা দেখার জন্য কয়েকটি মোবাইল টিম সারাক্ষণ নজরদারির কাজ করবে। যে সড়কগুলোতে বাস চলাচল করে সেই সড়কগুলোতে পর্যায়ক্রমে রিকশা চলাচল পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে হবে। অবশ্য রাত ১১টা থেকে ভোর ছয়টা পর্যন্ত ঐ সড়কগুলোতে রিকশা চলাচলের ওপর কোনোরূপ বিধিনিষেধ থাকবে না।

আমি নিজে অনেক রিকশাচালকের সাথে কথা বলেছি, তাদের কাছ থেকে জানতে পেরেছি, তারা অন্য কোন কাজ পেলে রিকশা চালাতে ইচ্ছুক নয় বলে জানিয়েছে। তবে বিভিন্ন পাড়ার ভেতর, গলির ভেতর, রিকশা চলাচল করতে পারে। অনেক রিকশাচালক ভাই আছেন যাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা এসএসসি হতে ডিগ্রী পর্যন্ত। গ্রামের বিভিন্ন সমস্যার কারণে বাধ্য হয়ে তারা রাজধানীতে রিকশা চালাচ্ছেন। শিক্ষিত রিকশাচালকদের যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর হতে প্রশিক্ষণ এবং ঋণ প্রদান করে তাঁদের স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলা সম্ভব। যারা লেখাপড়া জানেন না বা অর্ধশিক্ষিত তাদেরকে বিজিএমইএ-এর সাথে আলোচনা করে পোশাক শিল্পে চাকরি প্রদানের মাধ্যমে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করা যেতে পারে। জাতির বৃহত্তর স্বার্থের কথা বিবেচনা করে সরকারকে বাস্তবমুখী সঠিক পদক্ষেপ ও সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষা নদীকে সমন্বয় করলে ট্রলার বা লঞ্চ চলাচলের মাধ্যমে যানজট নিরসন করা সম্ভব হবে।

সিটি কর্পোরেশন, ওয়াসা, ডেসা, গ্যাস, টিএন্ডটিসহ সেবা প্রদানকারী সংস্থাসমূহকে সমন্বয় করে প্রয়োজনের সময় রাস্তা খুড়লে জনগণ তার সুফল ভোগ করবে। গাড়ির চালক ওভারটেকিং না করে ট্রাফিক আইন মেনে গাড়ি চালালে যানজট কমে আসবে, এক্ষেত্রে চালকদের সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য কর্মশালার আয়োজন করা যেতে পারে। পথে চলাচলকারীদের ফুটপাত ওভারব্রিজ এবং জেব্রাক্রসিং ব্যবহার করার প্রবণতা বৃদ্ধি করতে হবে।
ট্রাফিক পুলিশকে দায়িত্বের প্রতি আরও অধিক যত্নবান হতে হবে। মহাখালী, খিলগাঁও, মৌচাক-মগবাজার, মেয়র হানিফ ফ্লাইওভার চালু হয়েছে, কিছুদিনের মধ্যে মেট্রোরেল চালু হলে ঢাকায় যানজট অনেক কমে আসবে। করোনা মহামারীর কারণে রাজধানীবাসী কিছুটা স্বস্তিতে থাকলেও শান্তিতে নেই। চলতি বছর জনগণ ভ্যাকসিন পেলে পুনরায় পূর্বের অবস্থায় ফিরবে ঢাকাবাসী। স্কুল কলেজ খুলে গেলে যানবাহন চলাচলের মাত্রা আরও বৃদ্ধি পাবে। তখন যানজট প্রকট আকার ধারণ করবে।

এসব বহুবিধ কারণ বিবেচনা করে রাজধানীতে দ্রুত চলাচলের জন্য, যানজটবিহীন নগর গড়ে তোলার জন্য টেকসই এবং পরিকল্পিত সড়ক ব্যবস্থা, নিরাপদ সড়ক, মানুষের দ্রুত কর্মস্থলে যাবার এবং কর্মস্থল থেকে দ্রুত ঘরে ফেরার সড়ক ব্যবস্থা এবং পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। আশার কথা মেট্রোরেল পুরোপুরি চলাচল শুরু করলে হয়ত চলাচল ব্যবস্থা একটু দ্রুত হয়ে আসতে পারে। এরপরও রাজধানী ঢাকা মহানগরকে সবদিক দিয়ে আধুনিক, নিরাপদ করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

লেখক : ব্যবস্থাপনা সম্পাদক
দৈনিক বাংলাদেশ সময়
ই মেইল : salimhossainsweet@gmail.com