আমরা যদি না জাগি মা, কেমনে সকাল হবে

0
12

সেলিম হোসেন

লকডাউনের বিধিনিষেধ শিথিল হল। ক’দিন পরই কোরবানী ঈদ। এই ঈদে অধিকাংশ মানুষ গ্রামের বাড়িতে ঈদ করে। দেশে চলছিল কঠোর লকডাউন। কোনভাবেই এই লকডাউন শিথিল করার কারণ ছিল না। কারণ, সম্প্রতি দেশে করোনাভাইরাসে প্রতি চব্বিশ ঘণ্টায় দু’শো জনেরও বেশি মৃত্যু হচ্ছে। ব্যাপক সংখ্যায় এই মৃত্যুকে রুখে দিতে সরকার কঠোর লকডাউন ঘোষণা করেছে। সড়ক, বিভিন্ন এলাকা, শহর, নগর এবং অন্যান্য জনসমাগমের এলাকাগুলোতে কঠোর টহল দিচ্ছে পুলিশ, বিজিবি, সেনাবাহিনী ও র‌্যাব সদস্যবৃন্দ। কোনো জরুরি কারণ ছাড়া কাউকে বাইরে আসার অনুমতি দেয়া হচ্ছে না।
এতো করেও নগর, শহর, গ্রামে করোনাভাইরাস প্রতিরোধ করা যাচ্ছে না। সরকারি স্বাস্থ্য বিভাগ মানুষকে টিকাদান করে চলেছে। করোনভাইরাস প্রতিরোধে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী শহরে গ্রামে মাইকে ঘোষণা অব্যাহত রেখেছে কারণছাড়া বাইরে না আসতে, কোথাও জটলা না পাকাতে, নিরাপদ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে। বাইরে বের হবার সময় শারীরিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে বের হতে, বাইরে থেকে বাসায় ঢুকলে হাত ভালো করে সাবান দিয়ে ধুতে এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে। আমরা এসব কতোটুকু পালন করছি তা আমাদের সবারই জানা।
এখনো আমরা অনেকেই আছি যারা যখন-তখন বাসার বাইরে যাচ্ছি। বাসার বাইরে এলেই মুখে মাস্ক দিতে হয়, সে প্রয়োজনটুকু বোধ করছি না। পাড়া মহল্লার ভেতরের দোকানগুলোতে জম্পেশ আড্ডা দিচ্ছি। আর্জেন্টিনা, ব্রাজিলের খেলা নিয়ে গল্প করছি। খেলায় বিভিন্ন খেলোয়াড়ের ভুল শুদ্ধ আলোচনা করছি ঘণ্টার পর ঘণ্টা। বলতে গেলে কারো মুখেই মাস্ক নেই। এক কাপ চা নিয়ে চলে অনেক্ষণ সময় ব্যয়। গতকালও খুব বেশি রিকসা চলেনি, বাসও বন্ধ ছিল। হেঁটে অন্য পাড়া যাচ্ছি, বন্ধুদের সাথে কথা বলছি, গল্প করছি। প্রবীণরাও চায়ের দোকানগুলোতে বসছেন। বাজার করছি। একবারের বাজার, দু’তিনবার করতে যাচ্ছি। পাড়ার ভ্যানগাড়িতে করে আম, কাঁঠাল, সবজি নিয়ে পসরা বসে। সেখানে গিয়ে অনর্থক সময় ব্যয় করছি। কোনোকিছুতে গ্রাহ্যি নেই। প্রতিদিনই কারো না কারো মৃত্যুসংবাদ আসছে। তবু কোন সম্বিৎ ফিরছে না আমাদের।
বৃহস্পতিবার থেকে লকডাউন শিথিল হয়েছে। গত ঈদে কঠোর লকডাউন থাকা সত্বেও মানুষ রিকসায়, মোটরসাইকেলে, মাইক্রোকারে হুড়োহুড়ি করে বাড়িতে যায়। প্রতি ঈদে মানুষ যেমন বাড়ি যাবার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়ে, ঠিক সেরকমই অবস্থা সৃষ্টি করেই তৈরি পোশাক, নির্মাণ কর্মীরা বাড়ি যায় গত ঈদে। কঠোর লকডাউন তাদের এতোটুকু বদলাতে পারেনি।
এসব অবস্থা দেখে সরকার এবার, করোনাভাইরাসে আরো বেশি মানুষের মৃত্যু হতে থাকলেও অনেকটা নিরুপায় হয়ে বিধিনিষেধ শিথিল করে দিয়েছে। বাস ও ট্রেন চলাচলের অনুমতি দিয়েছে। এবারো শুরু হয়েছে গাদাগাদি করে মানুষের চলাচল।
এবার কী আমরা একটু সজাগ হয়ে চলাচল করবো? আমাদের কাছে এবারে জীবন আগে, নাকি ছুটি কাটানো আগে বলে বিবেচিত হবে? সচেতন মহল এ নিয়ে কিছুই বলতে পারছে না। তাঁরা আশা করছেন, মানুষ সাবধানতার সাথে বাড়ি ফিরবে এবং সাবধানতার সাথে কর্মস্থলে ফিরে আসবে। কিন্তু এসবের কিছুই আগে থেকে বলা যায় না। কারণ সরকারি বিধিনিষেধের প্রতি আমরা এখনো খুব বেশি সচেতনতা দেখাতে পারছি না। প্রতিদিন টিভিতে অজস্র মৃত্যুর খবর দেখছি, শুনছি, তবু নিজেদের বিধিনিষেধের ভেতর আটকিয়ে রাখতে পারছি না। সারা বিশে^র মানুষ আইন মানে, সরকারের কথা শোনে, কিন্তু আমরা তেমন একটা গা করি না।
তবুও এখানে বলে রাখা উচিত, আমাদের একটু সচেতন হতে হবে। সরকার লকডাউন শিথিল করেছে বলেই আমরা হুটোপুটি করে চলাচল করবো, একজনের সাথে অন্যজন গা ঘেঁষে চলাচল করবো, পিঠে হাত দিয়ে অন্য বন্ধুর সাথে কথা বলবো, ঈদের আনন্দে একজন অন্যজনকে জড়িয়ে ধরবো Ñ এমনটি আদৌ করা সঙ্গত নয়। কারণ আমরা জানি না কার মধ্যে করোনাভাইরাস রয়েছে, কে আক্রান্ত হয়েছে। যারা বাস, মিনিবাস, সিএনজি বা অন্যান্য যানবাহন চালাবে, তাদেরও দায়িত্ব রয়েছে, গাদাগাদি করে যাত্রী না নিয়ে নিয়ম অনুসারে একটি আসন ফাঁকা রেখে অন্য আসনে যাত্রী বসাতে। যাত্রীদেরও এই নিয়ম মেনে চলা উচিত। যে কেউ হোক না কেন, তাকে মাস্ক পরতেই হবে। শারীরিক ব্যবধান বজায় রাখতেই হবে। হাত ধরাধরি, বা গা ঘেঁষাঘেষি করে দাঁড়িয়ে কথা বলা আদৌ যুক্তিসঙ্গত নয়। করোনা প্রতিরোধে আমাদের প্রত্যেককেই সচেতন হতে হবে।
এই সচেতনতা এমন একটি জিনিস যা নিজের ভেতর থেকে আসে। জোর করে কেউ ঠেসে দিতে পারে না। ১৯৭১ সালে আমরা যখন স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ি তখন সেই যুদ্ধ করার মানসিকতা, সাহস, ত্যাগ স্বীকার, মৃত্যুকে ভয় না করে নিজের দেশকে মুক্ত করবার দৃঢ় আকাঙ্খা, দৃঢ় প্রত্যয়, শত্রুকে রুখে দাঁড়াবার চেতনা আমাদের ভেতর থেকে এসেছিল, কেউ আমাদেরকে তা বলে দেয়নি। হাঁ, বঙ্গবন্ধুর উদাত্ত আহ্বান ছিল। পরে তিনি তো পাকিস্তান বাহিনীর হাতে বন্দি ছিলেন। তার পরও কেমন করে আমরা একদিন নয়, একমাস নয়; দীর্ঘ নয় মাস পাকিস্তান বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছি। আমাদের অস্ত্র ছিল না, ছিল না কোনো প্রশিক্ষণ। তার পরও কেমন করে বিশে^র একটি সেরা বাহিনী পাঞ্জাব রেজিমেন্টের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলাম। নিজেদের দেশ ছেড়ে ভিন্ন দেশে শরণার্থী হয়েছিলাম। খেয়ে, না খেয়ে সেখানে ছিলাম আর নিজেদের তরুণ, কমবয়েসি ছেলেদের যুদ্ধে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। মেয়েরা ছুটে গিয়েছিল আহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা করার কাজে। অনেক বৃদ্ধা মাথায় করে বস্তাভরে গুলি বহন করে নিয়ে এসে তরুণ যোদ্ধাদের সরবরাহ করেছিলেন। বাড়ি ঘরে আগুন লাগিয়ে দেয়া হয়েছিল। তাও কেমন করে, কোন সাহসে প্রশিক্ষিত একটি দলের বিরুদ্ধে আমরা যুদ্ধ করে জিতেছিলাম। তার একটি বিশেষ কারণ ছিল আমাদের চেতনা। স্বদেশপ্রেম। আমাদের মাঝে একটি সচেতনতা কাজ করেছিল, আমাদের দেশকে শত্রুমুক্ত করতে হবে। আমাদের দেশকে রক্ষা করতে হবে। সেই চেতনাবোধ, সেই সচেতনতা আমাদের আবার ফিরিয়ে আনতে হবে।
মৃত্যু অনিবার্য। এর হাত থেকে কেউ রক্ষা পায় না। কিন্তু পৃথিবীতে আমরা যে কয়েকদিন আছি, সে কয়েকদিন সুন্দরভাবে বাঁচতে চাই। আমাদের সুন্দরভাবে সুস্থভাবে বাঁচতে হবে। এটি মানবজীবনের মূলমন্ত্র। করোনাভাইরাসে আমাদের মৃত্যু না হলেও একদিন আমাদের মরতেই হবে। তাই বলে যতক্ষণ জ্ঞান রয়েছে, ততোক্ষণ আমাদের সচেতনভাবে চলতে হবে। আমাদেরকে সেই জ্ঞানের সর্বোত্তম প্রয়োগ করে চলতে হবে, বাঁচতে হবে। আমাদের উত্তরাধিকারীদের জন্য একটা সুন্দর পৃথিবী, সুন্দর দেশ রেখে যেতে হবে। এই বোধ, এই চেতনা জাগ্রত করতে হবে। দেশকে ভালবাসতে হবে। দেশের আইন-কানুনকে মেনে চলতে হবে। পৃথিবীর মানুষের সাথে আমাদের তাল মিলিয়ে চলতে হবে। বাঙালি জাতির হাজার বছরের ঐতিহ্য সংস্কৃতি বুকে লালন করার সচেতনতা জাগিয়ে তুলতে হবে। বহু আগে আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম একবার তাঁর কবিতা খোকার সাধ-য়ে বলেছিলেন,
আমরা যদি না জাগি মা কেমনে সকাল হবে . . .
সে কথাটিই আজ মনে করবার দিন এসেছে আমাদের। আমাদের যদি সচেতনতা না আসে তাহলে এই মরণঘাতী ভাইরাসকে আমরা ঠেকাবো কিভাবে?
বিশ্বঘাতী প্রাণহননকারী এই ভাইরাসকে ঠেকাতে গেলে আমাদের সবারই সচেতন হতে হবে। সচেতন না হলে মৃত্যু ক্রমেই আমাদের কাছে আসতে থাকবে। কোন সময় হয়ত আমাদের এমন আপন একজনকে ছিনিয়ে নেবে, তাতে আমাদের বুক ফেটে যাবে, অথচ তাকে আর ফেরানো যাবে না। কথায় আছে, যার যায়, সেই বোঝে। সেই চরম বোঝার আগে আমাদের সবাইকে সচেতন হয়ে উঠতে হবে। করোনাভাইরাস থেকে নিজেদের মুক্ত রাখতে, নিজেদের নিরাপদ রাখতে আমাদের সচেতন হয়ে উঠতে হবে। কবি কাজী নজরুলের সেই কবিতার চরণটি কঠোরভাবে মনে গেঁথে নিতে হবে, আমরা যদি না জাগি মা কেমনে সকাল হবে . . . .

লেখক : ব্যবস্থাপনা সম্পাদক, বাংলাদেশ সময়
salimhossainsweet@gmail.com