উপদেশ বা আক্ষেপের কথা নয় এটা সচেতনতা মাত্র

0
2

সৈয়দা শবনম মুস্তারী

বন্ধু-বান্ধবী বা যাঁরা বাচ্চা-কাচ্চার মা বাবা হয়েছেন সবার অবগতির জন্য আমার এ লেখা। আপনারা যাঁরা আপনাদের সন্তানদের অনেক আশা নিয়ে অনেক সুন্দর কওে, সুন্দর মানসিকতা নিয়ে ভালো ভালো বিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয়ে পড়াচ্ছেন, তাঁদের জন্য। কারণ, আপনাদের সবার আশা আপনাদের সন্তানই যেন সব বাচ্চাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হয়। এটি প্রতিটা বাবা মা-ই চায় যার যা সমর্থ অনুযায়ী।
আমার এই লেখার কারণ অবশ্যই আছে, বাচ্চারা যে ধরনের ভুল করছে এসব দেখে মনে হয় সবাই একটু হলেও অনুমান করতে পারছেন সমসাময়িক কোন্ বিষয়টা নিয়ে আমি বোঝাতে চাইছি। আসলে এটার পেছনের কারণটা খুঁজুন আপনি! বাবা মা Ñ কি কোন অংশে একটু হলেও নিজেদের দায়ী মনে করেন না! বাচ্চারা এই বয়সে কি করছে, কোথায় যাচ্ছে Ñ এসব বিষয়ে আগ্রহী চোখ রাখা নিতান্তই জরুরি। আবার সে যদি বড় একটা বিদ্যালয়ে পড়ে আর বাবা মা যদি তেমন আধুনিক বিদ্যালয়ে না পড়ে থাকে তখন, অনেক সময় বাচ্চারা বলে, বাবা তুমি কথা বুঝবা না, আমাদের বিদ্যালয়ের ব্যাপারটাই ভিন্ন। আমি অনেক বাচ্চার এমন ব্যবহার, এমন কথা বলা শুনেছি এবং দেখেছিও।
বিষয়টি দুঃখজনক। কারণ, প্রত্যেকের জীবন বা প্রাথমিক জীবন, তাঁদের সময়ে সেটাই সবচেয়ে আধুনিক জীবন ছিল। আজও তাই। আমি এ বিষয়টি নিয়ে লিখছি, এটার পিছনেও একটা কারণ আছে, আমাদের দেশের উন্নতির মূল বিচার্য বিষয় এখন যেন হয়ে দাঁড়িয়েছে, কারা তাঁদের ছেলে মেয়েদের ইংরেজি মিডিয়ামে পড়াচ্ছেন সেটা দিয়ে। আমি সামনে দেখেছি একজন ঢাকার বাইরে বড় হওয়া পড়াশুনা করতে থাকা মা তার বাচ্চাকে পাড়ার একটা ইংরেজি ভার্সানের বিদ্যালয়ে পড়াচ্ছেন। সেই মায়ের সব আত্মীয় স্বজন ফোনে বলছেন, কি তোর বাচ্চাকে নাকি ইংলিশ মিডিয়ামে দিয়েছিস? খুব ভালো লাগছে শুনে। তাঁরা খুশি হলেও আমি এসব শুনে ব্যথিত হই।
তাই বলে আমি কোন ইংরেজি ভার্সানের বিদ্যালয়কে ছোট করে দেখছি না। আগে হাতে গোনা কয়েকটা ইংলিশ মিডিয়াম বিদ্যালয় ছিল সেখানে পরিবারের সব কিছু জেনে এবং বাবা মাকে ইংরেজিতে কথোপকথনের মাধ্যমে ছাত্র-ছাত্রীদের ভর্তি করা হোত আমার জানামতে। আমি প্রচারনা চালাতে চাই না, নাম উল্লেখ করছি না, যাঁরা জানেন তাঁরা তো জানেন-ই। তখন এত খারাপ কিছু ঘটত না, সেটা ছিল সম্পূর্ণ পারিবারিক শিক্ষা এবং সুস্থ শিক্ষা ছিল, বিনোদনের মধ্যে আবধ্য ছিল তা।
এখন এই ফেসবুকের যুগে সামাজিক এই ভার্চুয়াল মাধ্যমের নিয়ত ব্যবহারে সত্য মিথ্যা অনেক খবর যেমন পাই তেমনি শিক্ষা ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও অনেক ভুল শিক্ষনীয় বিষয় হরহামেশাই দেখতে পাই। যে সব বাবা মা জানে না তারা বাচ্চাদের যেটা সঠিক বলে দিচ্ছেন, তা আসলেই সঠিক নয়। আর সব চাইতে সমস্যা হচ্ছে, বাবা মায়ের ধারণা খুব স্বল্প! বাচ্চাদের যখন তাঁরা সঠিকটা শেখাতে চাচ্ছেন তখন বাচ্চারা নেটেরটা বেশি গ্রহণযোগ্য মনে করছে। আসলে আমরা এখন একটা খুব কমপ্লিকেটেট বা জটিল জায়গাতে আছি।
এটার কারণ খুব অল্প সময়ে এক পক্ষের হাতে অধিক টাকার ঝনঝনানি, সামাজিক স্ট্যাটাস রক্ষায় যা খুশি তাই করার উদগ্র মনোভাবের সৃষ্টি। বাচ্চাদের হাতে প্রয়োজনের চাইতে অধিক পরিমাণে টাকা তুলে দেয়া! বাবা মা মনে করতে চান, তাদের বাচ্চারা সমাজকে বুঝিয়ে দিক, তুমি অনেক রিচ বা বিত্তবান পরিবারারের সন্তান। আসলে সামজিক বা মানসিক একটা অধঃপতন আজ আমদের এই অবস্থায় নিয়ে গিয়েছে।
যে সমাজে একটা দামী ফোন হাতে না থাকলে তার স্ট্যাটাস বা সামাজিক অবস্থান বজায় থাকে না, যে সমাজে আমার পদবীর পরোয়া না করে দামী রেস্তোরাঁয় গিয়ে বন্ধুদের নিয়ে আড্ডা দেয়াকে বড় মনে করে, সেই সমাজে এমন ঘটনা ঘটবেই। এমন অবস্থা আসবেই। এটা খুব স্বাভাবিক তাই! আমি চারদিকে এমন অবস্থাই দেখছি। আমার চারদিকে অনেক কম বয়সের টীনরা (১৩ বছর থেকে ১৯ বছরের ছেলে মেয়েরা) অনেক বেশি মূল্যের রেস্তরাঁয়, হোটেলগুলোতে, শপিংমলের রেস্তরাঁগুলোতে হামেশাই বসছে।
এখন এমন একটা সামাজিক অবস্থানে আছি যেখানে দেখি মায়েরা-বাবারা বিভিন্ন গ্রুপে তাদের ছেলে মেয়েদের এমন খবর ও ছবি দিয়ে সামাজিক মাধ্যমগুলোতে এসব খবর দিচ্ছেন। এটা আমি মনে করি তাদের জ্ঞানের দৈন্যতা।
আমার লেখাটা অবশ্যই নেতিবাচক দিকে না নিয়ে ইতিবাচকভাবে নিন। কারণ আমাদের নিজস্ব একটি সংস্কৃতি রয়েছে, রয়েছে সমাজ ব্যবস্থা, রয়েছে হাজার বছরের ক্রমে ক্রমে গড়ে ওঠা একটি সভ্যতা, রয়েছে একটি লোকাচার, জীবনবোধ, স্বজন-বান্ধব পরিবেশ। দেশের বহু স্থানেই মসজিদের পাশাপাশি রয়েছে মন্দির। হযরত শাহজালাল (রঃ) যখন ৩৬০ জন আউলিয়া নিয়ে ১২ শতকের শেষদিকে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে সিলেটে আসেন, তখন এই ভূভাগে কোন মারামারি, খুনোখুনি, হত্যাযজ্ঞ হয়নি। কোন মানুষের রক্ত ঝরেনি, আজকাল কথায় কথায় যেমনটি হচ্ছে আফগানিস্তানে, ইরানে, ইরাকে; তেমনটি কখনো হয়নি। তাঁর মানবতাবোধ, সম্প্রীতি, একের সাথে অন্যের পাশাপাশি বসে আহার-নিদ্রা দেখে মানুষ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। সমাজে উচ্চবর্ণের হিন্দুরদের দ্বারা নিম্নবর্ণের মানুষদের ম্লেচ্ছ ভাবার কোন প্রচলন তাঁদের মাঝে না দেখে মানুষ সেই মতবাদে, সেই ধর্মে দীক্ষিত হতে থাকে।
সন্ধ্যায় একদিকে মন্দিরগুলো থেকে কাসার ঘণ্টা বেজে উঠত, শাঁখের ভেঁপু ভেসে আসত, পাশাপাশি মসজিদগুলো থেকে আযানের ধ্বনী ভেসে আসত। কখনো কোনটার সাথে কোনটির সংঘাত ছিল না। হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধরা নিজেদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান নিজেরা পালন করত। নিজেদের অনুষ্ঠানে অন্য সম্প্রদায়ের, অন্য ধর্মের মানুষদের দাওয়াত করত, তারা আসত। এসব দৃশ্য শরৎচন্দ্রের উপন্যাসে অনেকবার উল্লেখ করা রয়েছে। মীর মশারফ হোসেনের উপন্যাসে অনেক রয়েছে।
সন্ধ্যার পর গ্রামের অনেক দোকানের পাশে প্রদীপ জ¦লিয়ে মৈমনসিং গীতিকা পাঠ করতেন একজন, অন্য আরো পাঁচ-দশজন মনযোগ দিয়ে শুনতেন। বড়দের কথা মেনে চলতেন সব তরুণরা। কারো ঘরে খাবার না থাকলে অন্য গৃহস্থ তার গোলা থেকে ধান বের করে দিত। একজনের জমি চাষ করতে গরু না থাকলে অন্যজন তার গরুর দিয়ে চাষ করানোর সুযোগ করে দিত। এ ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। এমনটিই ছিল নিত্যদিনের সমাজের চিত্র। সেই সমাজই যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। এখনো ঢাকার বুকে অনেক মন্দিরের পাশে রয়েছে মসজিদ, এ নিয়ে মুসলমানরা বা হিন্দুরা কোন আপত্তি কখনো তোলেনি। যখন সন্ধ্যার সময় আযান পড়ছে, তখন জোড়ে জোড়ে ঢোলের বারি পড়ছে দুর্গার মঞ্চে। কোথাও কোন অসঙ্গতি নেই।
আমাদের সমাজের চিত্র আমাদের নিজস্ব। আমাদের স্বকীয়তা আমাদের সৃষ্টি। এগুলো হাজার বছরের ঐতিহ্য। এ কারণে, আমি বলতে চাচ্ছি, আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি, ঐতিহ্য দেশজ লোকাচার ভুলে গেলে বর্তমান তরুণ সমাজ কক্ষচ্যুত হয়ে পড়বে। তাদের পরিচয় হারিয়ে ফেলবে। ক’দিন পর সন্তানরা তাদের বাবা মাকে বলতে থাকবে, মা তুমি এসবের কিছু বুঝবে না। এসব বর্তমান যুগের স্ট্যাটাস বা ধারা। আসলেই এসব বর্তমান যুগের ধারা নয়, বরং বাবা মাকে সন্তানদের কাছ থেকে দূরে ঠেলে দেয়ার এক অপচেষ্টা মাত্র। যে বাবা মা তাদের সন্তানদের এমন মানসিকতাকে প্রশ্রয় দেবে, পরবর্তীতে সেসব বাবা মায়ের স্থান হবে বৃদ্ধাশ্রমে। এ সত্যতা স্বীকার করে নিতেই হবে আমাদের।
মনে রাখবেন আপনার ছেলেমেয়ের বয়সটা কেমন। কারণ একটা নির্দিষ্ট বয়স আছে যখন তারা বাবা মায়ের কিছু জিনিষ তাদের মধ্যে নিতে ভালবাসে এবং শেখে। তাদের এ বয়সে পিতা মাতাকে সত্যিকার শিক্ষা, প্রমীত শিক্ষা দিতে হবে। দেশজ শিক্ষায়, দেশজ মানসিকতায় বড়ো করে গড়ে তুলতে হবে। তারা বাবা মা বড় ভাই বোনদের কাছে যেন প্রকৃত শিক্ষা লাভ করে।
তাই সবার আগে যে সন্তানকে আপনি পৃথিবী আলোতে এসেছেন তাদের ভাল খারাপ আপনাকেই দেখতে হবে। কারণ প্রতিটা ভাল স্থাপনারই একটা মজবুত ভিত্তি থাকে।
লেখক : কলামিস্ট ও গবেষক