করোনা ও ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাবে অতিষ্ঠ জনজীবন

0
3

সৈয়দ ফারুক হোসেন

বৈশ্বিক মহামারি করোনা সংক্রমণের ভয়াবহতা বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি দেশে ডেঙ্গুর সংক্রমণও আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে। করোনায় প্রতিদিনই আক্রান্ত এবং মৃত্যুর হারে রেকর্ড গড়ছে, অন্যদিকে ডেঙ্গুতেও আক্রান্ত এবং মৃত্যুর সংখ্যা উর্ধ্বমুখী। এ যেন ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’। পরিস্থিতি এখন এমন ভয়াবহ যে, রাজধানীর সরকারি কিংবা বেসরকারি হাসপাতালের কোথাও রোগীর খালি বেড নেই। হাসপাতালের ওয়ার্ড কেবিন এমনকি সরকারি হাসপাতালের বারান্দাও এখন রোগীতে ভরে গেছে। প্রতিদিনই হাসপাতালগুলোতে ভর্তি করতে এসে বেড না পেয়ে নতুন রোগীর স্বজনদের উৎকণ্ঠা আহাজারি চোখে পড়ার মতো। ডেঙ্গু আর করোনা রোগীর চাপে হাসপাতালের কোথাও বেড বা কেবিন খালি নেই। এ নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। বিশেষকরে রাজধানীতে করোনার ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণের মধ্যেই শংকার বার্তা দিচ্ছে ডেঙ্গু। করোনাভাইরাসের মধ্যে মশাবাহিত ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্তদের সংখ্যা গত বছরের চেয়েও ৫০ ভাগ বেশি। দ্রুততম সময়ের মধ্যে ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে প্রাদুর্ভাব আরো বেড়ে যেতে পারে। করোনায় ঘরবন্দী মানুষ মশার কারণে ডেঙ্গু আতঙ্কে দিন পার করছেন। বেশি আতঙ্কে আছেন নিম্নআয়ের কর্মজীবী মানুষ। বেকার হয়ে ঘরে বসে থাকায় একদিকে দেখা দিয়েছে খাদ্য সংকট, অন্যদিকে করোনা-ডেঙ্গুর ভয়াবহতা। সবমিলে আতঙ্ক-উৎকণ্ঠায় দিন কাটছে তাদের। দিনের বেলায় মশার উৎপাত তুলনামূলক কম থাকলেও সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে। এর মধ্যে গত কয়েকদিনের লাগাতার বৃষ্টি হওয়ায় বাসা-বাড়িতেও জল জমে গেছে। এ জলে জন্মি নিচ্ছে ডেঙ্গুর মশা। ফলে করোনার ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণের মধ্যেই দেশে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়তে শুরু করেছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। নগরের ঘরে-বাইরে, অফিস-আদালত প্রায় সবখানেই মশার উপদ্রব ক্রমেই বেড়ে চলেছে। রাজধানীজুড়ে এখন মশার যন্ত্রণা এতটাই বেড়ে গেছে যে, সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিস্থিতি অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে খারাপ। মশার এমন উপদ্রবে এর আগে কখনো ভুগতে হয়নি রাজধানীবাসীকে। অনেক বাসায় দিনদুপুরেও মশারি টানিয়ে রাখতে হচ্ছে ক্ষুদ্র এ প্রাণীটি থেকে রক্ষা পেতে। ভুক্তভোগী নগরবাসীরা জানান, দীর্ঘদিন ধরে মশার ওষুধ না ছিটানো এবং নালা-নর্দমা পরিষ্কার না করায় দিন দিন মশার উপদ্রব বাড়ছে। মশার মাধ্যমে চিকুনগুনিয়া, ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু, ফাইলেরিয়া, পীত জ্বর, ভাইরাস প্রভৃতি মারাত্মক রোগে সংক্রমিত হচ্ছে মানুষ। স্প্রে, কয়েল, অ্যারোসল কোনো কিছুতেই মশা তাড়ানো সহজ হচ্ছে না। আবার এসব দিয়ে মশা তাড়ালেও আমাদের স্বাস্থ্য এতে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই প্রাকৃতিক উপায়ে মশা তাড়ানোর ব্যবস্থা করা জরুরি। বর্তমানে বাংলাদেশের শহর-বন্দর, গ্রাম-গঞ্জ সর্বত্র মানুষ মশার উপদ্রপে বিপর্যস্ত। মশা নেই এমন জায়গা খুঁজে পাওয়া কঠিন। এই মশার কারণে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগের শিকার কোমলমতি ছাত্রছাত্রী ও গর্ভবতী মায়েরা। বাসা-বাড়ি, অফিস-আদালত, অভিজাত এলাকা থেকে শুরু করে রাজধানীর সর্বত্র মশা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, জীবাণু Ñ সবই বহন করে এই মশা। শুধু বহন করেই ক্ষান্ত হয় না, সামান্য এক কামড়ে এসব ছড়িয়ে দিতে পারে একজন থেকে আরেক জনের শরীরেও। এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর এডিস মশা। আন্তর্জাতিক এক পরিসংখ্যান বলছে, মশার কারণে শুধু এক বছরে নানা রোগে আক্রান্ত হয় বিশ্বের ৭০ কোটির মতো মানুষ। তাদের মধ্যে মারা যায় ১০ লাখেরও বেশি। বাংলাদেশেও প্রতিবছর বহু মানুষের মৃত্যু হয়। মশা বংশবৃদ্ধি করে নগরবাসীর জীবন বিপন্ন করে তুলেছে। নিষ্কাশনের অভাবে পানি জমে থাকা শহরের ড্রেনগুলো পরিণত হয়েছে মশার প্রজনন কেন্দ্রে। কোথাও স্বস্তিতে কাজ করা যাচ্ছে না। রাজধানীর প্রায় প্রতিটি এলাকায় খাল, নর্দমা, ডোবায় জমে থাকা পানি নষ্ট হয়ে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। সেসব স্থানে মশার লার্ভা তৈরি হচ্ছে। স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে শুরু করে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বিখ্যাত বিজ্ঞানীরা প্রথম থেকেই করোনা মোকাবেলার ক্ষেত্রে সুরক্ষাবিধি মেনে চলার উপর গুরুত্ব দিয়ে আসছেন। সুরক্ষাবিধি মানার পাশাপাশি লকডাউন বাস্তবায়নের মাধ্যমে মানুষকে ঘরে রেখে এই সংক্রমণ হার কমানো যায়। জনগণের বিশাল একটি অংশ স্বাস্থ্যবিধি না মেনে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়িয়েছে। রাস্তা-ঘাট-বাজারে সর্বত্র একসাথে মানুষকে স্বাস্থ্যবিধি না মেনে অযথা ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়। দুই ঈদে জনগণের অনিয়ন্ত্রিত চলাফেরা এবং স্বাস্থ্যবিধি না মানার ফলে করোনা বেড়ে গেছে। কোভিড-১৯ মহামারির মধ্যেই ডেঙ্গুর সংক্রমণ বাড়ছে ফলে একই ব্যক্তি একইসাথে করোনা ও ডেঙ্গু উভয় ভাইরাসের দ্বারা সংক্রমিত হচ্ছে। করোনা ও ডেঙ্গু দুই ধরনের ভাইরাস হলেও প্রাথমিক অবস্থায় এদের কিছু উপসর্গ বা লক্ষণ একই ধরনের। রোগ বাড়লে এদের লক্ষণের বোঝা যায়। করোনা খুবই সংক্রমিত একটি ভাইরাস যা মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমিত হয়ে থাকে। মানুষের কফ, থুতু, নাকের সর্দি বা সংক্রমিত কোনো কিছু স্পর্শের মাধ্যমে ছড়ায়। আর ডেঙ্গু ভাইরাস প্রধানত মশার মাধ্যমেই ছড়ায়। কোভিড-১৯-এর নির্দিষ্ট লক্ষণ হচ্ছে কাশি, গলা ব্যথা ইত্যাদি আর ডেঙ্গুর নির্দিষ্ট লক্ষণ হচ্ছে গুরুতর মাথাব্যথা, শরীরব্যথা এবং দেহের ফুসকুড়ি ওঠা ইত্যাদি। তবে ডেঙ্গুতে কাশির লক্ষণও এখন অস্বাভাবিক নয় কারণ প্রতিবছরই ডেঙ্গুর লক্ষণ কিছুটা বদলাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্যকর্মীদের এ বিষয়ে অধিকতর সর্তকতার পাশাপাশি ভাইরাসদ্বয়ের সহ-আক্রমণ কীনা তা নির্ভুল পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হতে হবে। কারণ কোভিড-১৯-এর আক্রান্ত অবস্থায় ও ডেঙ্গুর সংক্রমণ সত্যিই দুশ্চিন্তার বিষয়।
করোনা এবং ডেঙ্গু মানুষের সামাজিক অর্থনৈতিক পারিবারিক মানসিকÑ সার্বিকভাবে পঙ্গু করে দিচ্ছে। মহামারি করোনাভাইরাস একদিকে মানুষের প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে, অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্থ করছে তার ভবিষ্যৎ চলার পথকেও। করোনার আগ্রাসনে কর্মক্ষেত্র কমে যাওয়ায় বাড়ছে বেকারত্ব, বিভিন্ন পেশায় কর্মরতরা বেকার হয়ে পড়ছে; শিক্ষিত তরুণদের কাজের সুযোগও সীমিত হয়ে পড়েছে। ফলে করোনায় তরুণদের অনেকেই হচ্ছে হতাশাগ্রস্থ ও বিপথগামী। জড়িয়ে পড়ছে নেশা, ধর্ষণ, ছিনতাই ও নারী নির্যাতনসহ নানা সন্ত্রাসী কমর্কান্ডে। করোনার আতঙ্ক প্রতিটি মুহূর্ত যেন তাড়া করছে মানুষকে। একেকটি দিন পার করা করোনামুক্ত সময়ে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানুষের স্বাভাবিক জীবন-জীবিকা হুমকির মুখে পড়ছে। স্থবির হয়ে পড়েছে কর্মসংস্থানের পথ। বাড়ছে অর্থসংকট। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের এক নীরব ঘাতকের নাম দারিদ্র্যে দুষ্টচক্র। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল ও অনুন্নত সব দেশেই এই সমস্যা আজ প্রকট আকার ধারণ করেছে। এই দারিদ্র্যতা দেশের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করেছে আজ। এই মহামারিতে দেশে দারিদ্র্যতা আরও প্রকট আকার করেছে।
উপসর্গ থাকুক আর না-ই থাকুক, অধিকসংখ্যক মানুষের করোনা পরীক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। পরীক্ষায় কারও সংক্রমণ ধরা পড়লে দ্রুত চিকিৎসাসেবা দিতে হবে। গুরুতর না হলে বাড়িতেও সেটি করা যায়। করোনা একটি জাতীয় ও বৈশ্বিক দুর্যোগ, কেবল স্বাস্থ্য বিভাগের গুটিকয়েক কর্মকর্তাকে দিয়ে এর পরীক্ষা ও চিকিৎসাসেবা দেওয়া যাবে না। জনসচেতনতার পাশাপাশি পরীক্ষার কাজে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতৃত্ব, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি ও তরুণদের যুক্ত করতে হবে। আগামীতে ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত টিকা দেওয়া শুরু হচ্ছে। এটি নিঃসন্দেহে ভালো উদ্যোগ। তবে ইউনিয়নে একটিমাত্র টিকাকেন্দ্র থাকলে দূরদূরান্তের মানুষ এসে টিকা দিতে পারবেন না। সেক্ষেত্রে ইউনিয়নে একাধিক টিকাকেন্দ্র স্থাপন করতে হবে। প্রয়োজনে ভ্রাম্যমাণ টিকাকেন্দ্র স্থাপন করা যেতে পারে। ঘরে ঘরে ময়লা আবর্জনা পরিস্কার করে মশা তাড়ানোর জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। মহামারি করোনা এবং ডেঙ্গু থেকে রক্ষা পেতে হলে সরকারের পাশাপাশি প্রতিটি জনগণকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা ছাড়া অন্য কোন বিকল্প পথ খোলা নেই।
লেখক : ডেপুটি রেজিস্ট্রার, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়