কিন্ডারগার্টেনের শিশুদের ভবিষ্যৎ কী

0
8

সেলিম হোসেন

কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষক-শিক্ষয়ত্রীরা কোনো বেতন পাচ্ছেন না। বিশেষ করে মহানগরীর বাইরের শিশুতোষ এসব প্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষক শিক্ষিকা আদৌ বেতন পাচ্ছেন না। তাদের অবস্থা একদম নাজুক। তাদের জীবনব্যবস্থা ভেঙে পড়ার অবস্থা বিশ্ব মহামারী করোনাভাইরাস থেকে দেশবাসীর সুরক্ষার জন্য সরকারি নির্দেশনা অনুসারে গত বছরের ১৭ মার্চ থেকে দেশব্যাপী সরকারি-বেসরকারি সমস্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কিন্ডারগার্টেন এবং কোচিং সেন্টার বন্ধ হয়ে যায়।

এরই ধারাবাহিকতায় বর্তমানে চলছে সর্বাত্মক লকডাউন আর এই লকডাউনে আরও বিপাকে পড়েছে খেটে খাওয়া সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ ও কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষকরা। মহানগরে দেখা যাচ্ছে, বড় বড় বিদ্যালয় মহাবিদ্যালয়গুলো অনলাইনে ক্লাস নেয়। ক্লাস নেয়ার সুবাদে অভিভাবকদের কাছ থেকে নিয়মিত বেতন আদায় করে চলছে। আর সেখান থেকে শিক্ষকদের বেতন দেবার ব্যবস্থা করছে যদিও পুরো বেতন না দিয়ে কিছু অংশ কর্তন করে রাখছে।

অনেকে বলছেন, এই কর্তিত অংশ কবে দেয়া হবে তার কোনো ঠিক-ঠিকানা নেই। তবু তারা বেতন নামের একটি প্রাপ্য পাচ্ছেন। কিন্তু কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষক-শিক্ষয়ত্রীরা কোনো বেতন পাচ্ছেন না। বিশেষ করে মহানগরীর বাইরের শিশুতোষ এসব প্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষক শিক্ষিকা আদৌ বেতন পাচ্ছেন না। তাদের অবস্থা একদম নাজুক। তাদের জীবনব্যবস্থা ভেঙে পড়ার অবস্থা। সেদিন একটু অনুসন্ধানেই গিয়েছিলাম। দেখলাম, গাজীপুরের কালিয়াকৈরে কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষকরা মানবেতর জীবনযাপন করছেন। অর্থের অভাবে প্রতিষ্ঠান ব্যয় বহন করতে না পারায় ইতোমধ্যে কিছু প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে।

আবার কিছু প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন দোকান ও রেস্টুরেন্টে পরিণত হয়েছে। অনেক জেলা থেকে বন্ধুরা বলছে সেখানে অনেক স্থানীয় কিন্ডারগার্টেন বন্ধ হয়ে গেছে। আর সাথে চাকরি বন্ধ হয়ে গেছে সেখানে কর্মরত শিক্ষক-শিক্ষিকাদের। কোভিড-১৯ এর কারণে গাজীপুরের কালিয়াকৈরের ২৬০টি কিন্ডারগার্টেনে কর্মরত প্রায় ৫০০০ শিক্ষকের দীর্ঘ ১৪ মাস বেতন বন্ধ থাকায় পরিবার-পরিজন নিয়ে দুর্বিষহ জীবন কাটাচ্ছেন।
চক্ষুলজ্জার ভয়ে এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা লাইনে দাঁড়িয়ে ত্রাণ নিতেও পারছেন না। পারছেন না মুখ ফুটে কাউকে কিছু বলতে। কিন্ডারগার্টেন শিক্ষকদের পরিবারে চলছে নীরব দুর্ভিক্ষ, চোখে আছে ব্যাপক হতাশার ছাপ।

একদিকে রমজানের কারণে পরিবারের বর্ধিত ব্যয় বহন করতে হিমশিম খাচ্ছেন তারা, অপরদিকে সামনে আসছে ঈদুল ফিতর। এই ঈদ উপলক্ষে প্রত্যেক শিক্ষকের সন্তানসহ পরিবারের সকলেই নতুন জামার আশায় বসে থাকে। পবিত্র ঈদকে কেন্দ্র করে বাজারেরও একটি চাহিদা থাকে সকল পরিবারে। কিন্তু এসব শিক্ষক শিক্ষয়িত্রীরা তাদের পরিবারের জন্য কী করবে! তাদের চোখেমুখে দেখা দিয়েছে নীরব আর্তনাদ ও হাহাকারের চিত্র।

এক শিক্ষক বলেন, শিক্ষক হচ্ছে জাতির বিবেক রাষ্ট্র পরিচালকসহ সকল মানুষ গড়ার কারিগর। শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড। আর সেই মেরুদণ্ডকে দণ্ডায়মান করে রাখেন শিক্ষকরাই। অথচ তারা তাদের প্রাপ্য মর্যাদা পাচ্ছেন না। তার ক্ষেদোক্তি, আমার মনে হয় আমরা শিক্ষিত হয়ে ভুল করেছি, না পারছি মাঠে কাজ করতে, না পাচ্ছি কোনো বেতন-ভাতা। যারা সরকারি চাকরিজীবী তাদের তো কোনো চিন্তা নেই। যত সমস্যা আমাদের। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের সকল কিন্ডারগার্টেন শিক্ষকদের এ মানবেতর অবস্থা থেকে রক্ষার কেন এখনো ব্যবস্থা গ্রহণ করছেন না, বুঝতে পারছি না। আমরা কি জাতিকে কিছু দিই না?

এছাড়া, দীর্ঘদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় গাজীপুর উপজেলার প্রায় এক লাখ বিশ হাজার শিক্ষার্থীর পাঠ গ্রহণসহ সকল শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। মহামারীকালীন প্রায় দেশের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ব্যতীত পোশাক কারখানাসহ অফিস-আদালত এবং প্রায় সকল সেক্টরই খোলা রয়েছে। পোশাক কারখানায় প্রতিনিয়ত প্রচুর লোক যাতায়াত করেন এদের মধ্যে কেউ না কেউ শিক্ষার্থীদের অভিভাবকও রয়েছেন। শিক্ষার্থীরা তাদের মাধ্যমেও সংক্রমিত হতে পারত কিন্তু এ ব্যাপারে তেমন কোনো প্রভাব দেখা যায়নি। আর যেহেতু পরিসংখ্যানে দেখা যায় ৩০ বছরের নিচে লোকজনদের এই ভাইরাসটি তেমন ক্ষতি করতে পারে না তাই এখন বিদ্যালয়গুলো খুলে দেয়া যেতে পারে, এমন পরামর্শও দিচ্ছেন অনেক অভিভাবক। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আরও বেশিদিন বন্ধ থাকলে মালিক এবং শিক্ষকদের অবস্থা দিন দিন মারাত্মক আকার ধারণ করবে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার প্রতি অনীহা দেখা দেবে। তারা বিভিন্ন ধরনের গেমস এবং মোবাইলে আসক্ত হয়ে পড়বে। এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে শিক্ষার্থীরা ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হবে বলে দেশের অনেক চিন্তাবিদ ও শিক্ষাবিদ মনে করছেন। বিভিন্ন মিডিয়ায় আসছে এমন অশুভ বার্তা।

এক প্রতিষ্ঠানের পরিচালক মন্তব্য করেন, আমাদের কিন্ডারগার্টেনগুলো চলে একমাত্র শিক্ষার্থীর বেতনের উপর নির্ভর করে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ থাকায় কোনো শিক্ষার্থীর অভিভাবক বেতন দিতে চাচ্ছেন না। এ অবস্থায় আমরা প্রতিষ্ঠান ভবনের ভাড়া ও শিক্ষকদের বেতন দিতে পারছি না। পরিবারের ব্যয় ও চাহিদা মেটাতে ইতোমধ্যে আমি আমার গ্রামের বাড়িতে একটি কৃষি প্রজেক্ট করেছি পাশাপাশি আমার প্রতিষ্ঠানের একটি কক্ষে আমি জামা কাপড়ের দোকান করেছি। এ অবস্থায় অনেক দেন-দরবার করেছি। না ব্যাংক, না কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠান. কেউই আপৎকালীন কোনো ঋণ বা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়নি।

এসব বিষয় পরবর্তীতে আমাদের দেশ ও জাতির জন্য বিশাল সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে। এখানে যারা তৃতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম শ্রেণিতে পড়াশোনা করত, তারা পরবর্তী বছরগুলোতে, যখন করোনা মহামারী শেষ হয়ে আসবে, তখন কোন শ্রেণিতে গিয়ে ভর্তি হবে? কোথায় গিয়ে ভর্তি হবে? ইতোমধ্যে যেসব কিন্ডারগার্টেন বন্ধ হয়ে গেছে, যেখানে অন্য বাণিজ্যিক কেন্দ্র গড়ে উঠেছে, সেখানকার ছাত্র ছাত্রীরা কোন টি.সির (ট্রান্সফার সার্টিফিকেট) বদৌলতে আবারও পড়াশোনা শুরু করবে? এটি আমাদের দেশের জন্য একটি বিশাল সমস্যাই বৈকি। এই সমস্যা আদৌ হতো না যদি সরকার প্রথম থেকেই এসব কিন্ডারগার্টেনগুলোর একটি পরিসংখ্যান রাখত। কিংবা এসব পরিচালনার জন্য যদি একটি বরাদ্দ নিয়মিত দিত, তাহলে এখানে পড়ুয়ারা ভবিষ্যতের অন্ধকার বা অনিশ্চিত ছবি দেখতে পেত না।

বাংলাদেশ কিন্ডারগার্টেন অ্যাসোসিয়েশন গাজীপুর জেলার সমাজ কল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক ও শাহীন স্কুলের পরিচালক মো. মনিরুজ্জামান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে করোনা ভাইরাস নামক মহামারীর প্রভাবে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা এবং প্রতিষ্ঠানের ব্যয় বহন করতে না পারায় উপজেলায় ৫টি স্কুল ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। বিভিন্ন পত্রিকা এবং টেলিভিশনে প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে জানা গেছে অর্থের অভাবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের অসংখ্য কিন্ডারগার্টেন বেসরকারি বিদ্যালয় বন্ধ হয়ে গেছে।

দেশের বিভিন্ন প্রান্তের এমন অনেক শত শত বেসরকারি বিদ্যালয় রয়েছে, কিন্ডারগার্টেন রয়েছে যেগুলো নিছক অর্থের অভাবে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এখানে শিক্ষাগ্রহণকরা শিক্ষার্থীরা পরে যাবে কোথায়? তারা কী ঝরে পড়বে? তারা কী ভবিষ্যতে আর আলোর মুখ দেখতে পারবে না? তারা কী অশিক্ষিত-গোমূর্খ হয়ে বড় হতে থাকবে! এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিয়ে এমন অনিশ্চিত এমন হাজারো প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। সব কিছু ঠিক থাকলে সরকারকে একটি ফুটো কড়িও দিতে হত না এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। এরা নিজেরাই নিজেদের সঙ্গতি দিয়ে চলতো। কখনো সরকারের কাছ থেকে কোনোদিন কিছু চাইতে যায়নি তারা। কিন্তু করোনা শেষ হয়ে গেলে যখন এরা আবারো পড়তে আসবে, তখন এসে দেখবে, তাদের বিদ্যালয়ের স্থানটিতে বিশাল একটি কারখানা অথবা একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, সেখানে বিদ্যালয়ের চিহ্নমাত্র নেই। তখন তারা যাবে কোথায়?

লেখক : ব্যবস্থাপনা সম্পাদক

দৈনিক বালাদেশ সময়