খুলনায় করোনার ভয়াল থাবা

0
1

নিজস্ব প্রতিবেদক
খুলনা বিভাগে করোনাভাইরাস পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। প্রতিদিনই বাড়ছে মৃত্যু ও শনাক্তের সংখ্যা। খুলনায় আবারও একদিনে করোনায় সর্বোচ্চ মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। জেলায় গত ২৪ ঘণ্টায় করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ২২ জন। এরমধ্যে কুষ্টিয়ায় সর্বোচ্চ সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া খুলনা বিভাগে নতুন করে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন এক হাজার ৩৩ জন। এ নিয়ে বিভাগের ১০ জেলায় আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৩ হাজার ৬৪৪ জনে।
শনিবার দুপুরে বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক রাশেদা সুলতানা এ তথ্য নিশ্চিত করেন।
এদিকে একটি শয্যার বিপরীতে বিভাগে রোগী রয়েছে ৬.২১ জন। অর্থাৎ শয্যার তুলনায় রোগীর সংখ্যা ৬ গুণ বেশি।
অপরদিকে করোনা সংক্রমণ ও মৃত্যুহার আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় খুলনায় আগামী মঙ্গলবার থেকে এক সপ্তাহের কঠোর লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছে।
রাশেদা সুলতানা জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় কুষ্টিয়ার সাতজন, খুলনার তিনজন, সাতক্ষীরার চারজন, যশোরের তিনজন, চুয়াডাঙ্গার দুজন, মেহেরপুরে দুজন ও ঝিনাইদহের একজন করোনায় মারা গেছেন।
এর আগে বৃহস্পতিবার (১৭ জুন) বিভাগে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ১৮ জনের মৃত্যু হয়। এরপর শুক্রবার বিভাগে আটজনের মৃত্যু হয় করোনায়।
করোনা সংক্রমণের শুরু থেকে শনিবার সকাল পর্যন্ত বিভাগের ১০ জেলায় মোট শনাক্ত হয়েছেন ৪৪ হাজার ২৬৯ জন। করোনায় মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭৯৭ জনে। এসময় সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৩৪ হাজার ১২৬ জন।
বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদফতরের জেলাভিত্তিক করোনা সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, খুলনায় ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে করোনা শনাক্ত হয়েছে ১৪৯ জনের। এ নিয়ে জেলায় মোট ১২ হাজার ৫৯৮ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। এদের মধ্যে মারা গেছেন ২০৬ জন ও সুস্থ হয়েছেন ৯ হাজার ৯৩৪ জন। বাগেরহাটে নতুন করে করোনা শনাক্ত হয়েছেন তিনজনের। এ নিয়ে জেলায় মোট করোনা শনাক্ত হয়েছে ২ হাজার ৪৮২ জনের। আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ৬৩ জন ও সুস্থ হয়েছেন ১ হাজার ৭২২ জন।
আর সাতক্ষীরায় ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে শনাক্ত হয়েছেন ৫৬ জন। এ নিয়ে জেলায় মোট করোনা শনাক্ত হয়েছেন ২ হাজার ৮৫২ জন ও মারা গেছেন ৬০ জন। সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১ হাজার ১৯২৮ জন। যশোরে নতুন করে করোনা শনাক্ত হয়েছে ১৬৩ জনের। এ নিয়ে জেলায় মোট করোনা শনাক্ত হয়েছেন ৯ হাজার ৪০৭ জনের। এদের মধ্যে মারা গেছেন ১০৪ জন ও সুস্থ হয়েছেন ৬ হাজার ৭৪১ জন।
এদিকে ২৪ ঘণ্টায় নড়াইলে নতুন করে করোনা শনাক্ত হয়েছে ১৮ জনের। এ নিয়ে জেলায় মোট করোনা শনাক্ত হয়েছেন ২ হাজার ২১৮ জন। এদের মধ্যে মারা গেছেন ৩০ জন ও সুস্থ হয়েছেন ১ হাজার ৮৪৭ জন। মাগুরায় ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে শনাক্ত হয়েছেন ১০ জন। এ নিয়ে জেলায় মোট করোনা শনাক্ত হয়েছেন ১ হাজার ৩৮৫ জন। এদের মধ্যে মারা গেছেন ২৪ জন ও সুস্থ হয়েছেন ১ হাজার ২২০ জন।
অপরদিকে ঝিনাইদহে ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে শনাক্ত হয়েছে ২৪ জন। এ নিয়ে জেলায় মোট করোনা শনাক্ত হয়েছে ৩ হাজার ৩০৬ জন। এদের মধ্যে মারা গেছেন ৬২ জন ও সুস্থ হয়েছেন ২ হাজার ৮৬৮ জন। ২৪ ঘণ্টায় কুষ্টিয়ায় নতুন করে করোনা শনাক্ত হয়েছে ১১২ জনের। এ নিয়ে জেলায় মোট করোনা শনাক্ত হয়েছেন ৬ হাজার ১৭৪ জনের। এদের মধ্যে মারা গেছেন ১৪৭ জন ও সুস্থ হয়েছেন ৪ হাজার ৯৭৩ জন।
আর চুয়াডাঙ্গায় ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে শনাক্ত হয়েছেন ৭৬ জন। এ নিয়ে জেলায় মোট করোনা শনাক্ত হয়েছেন ২ হাজার ৫২৩ জন। এদের মধ্যে মারা গেছেন ৬৮ জন ও সুস্থ হয়েছেন ১ হাজার ৯৩৮ জন। মেহেরপুরে নতুন করে শনাক্ত হয়েছেন ১৪ জনের। এ নিয়ে জেলায় মোট শনাক্ত হয়েছেন ১ হাজার ৩১৪ জন। আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ৩৩ জন ও সুস্থ হয়েছেন ৯৫৫ জন।
বর্তমানে খুলনা বিভাগের হাসপাতালগুলোতে করোনা রোগীদের জন্য শয্যা রয়েছে মাত্র এক হাজার ৪৩৭টি। এর মধ্যে জেলা সদর হাসপাতালে ৯৩৭টি এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে রয়েছে ৫০০টি শয্যা। হিসাব করে দেখা যায়, বর্তমানে একটি শয্যার বিপরীতে বিভাগে রোগী রয়েছে ৬.২১ জন। অর্থাৎ শয্যার তুলনায় রোগীর সংখ্যা ৬ গুণ বেশি। যদিও এসব রোগীর বেশিরভাগই বাড়িতে থেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন। তবু হাসপাতালের ওপর চাপ ক্রমেই বাড়ছে। কারণ বিভাগে প্রতিদিনই আক্রান্তের নতুন রেকর্ড হচ্ছে।
শুক্রবার সকালে স্বাস্থ্য বিভাগের দেওয়া রিপোর্ট বিশ্লেষণ করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। জানা গেছে, বিভাগের খুলনা ও কুষ্টিয়ার হাসপাতালগুলোতে সবচেয়ে বেশি রোগীর চাপ রয়েছে।
খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক দফতর সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান সক্রিয় রোগীর মধ্যে খুলনায় ২৩৫২, বাগেরহাটে ৭৫০, সাতক্ষীরায় ৮৬৮, যশোরে ২৪০২, নড়াইলে ৩৩৩, মাগুরায় ১৩১, ঝিনাইদহে ৩৬৩, কুষ্টিয়ায় ৯৬৫, চুয়াডাঙ্গায় ৪৫০ ও মেহেরপুরে ৩২১ রয়েছেন। এর মধ্যে জেলা সদরের হাসপাতালগুলোর ৯৩৭টি শয্যার ৪৭৫ টিতে রোগী ভর্তি রয়েছেন। বাকি ৪৬২টি শয্যা খালি পড়ে আছে। আর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোর ৫০০ শয্যায় রোগীর তেমন চাপ নেই।
জেলা সদরের হাসপাতালগুলোর মধ্যে খুলনার ১৩০ শয্যায় ১৬৮, বাগেরহাটের ২০ শয্যায় ২০, চুয়াডাঙ্গার ১৫০ শয্যায় ৪০, যশোরের ১১১ শয্যায় ৫১, ঝিনাইদহের ৫০ শয্যায় ২১, কুষ্টিয়ার ৭০ শয্যায় ১০২, মাগুরার ৫০ শয্যায় ৭, মেহেরপুরের ৫২ শয্যায় ২৪, নড়াইলের ১২০ শয্যায় ২১, সাতক্ষীরার ১৮৪ শয্যায় ২১ জন রোগী ভর্তি আছেন।
এছাড়া বিভাগের ১০ জেলার ৫০টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে করোনা রোগীদের জন্য ১০টি করে ৫০০টি শয্যা রয়েছে। কিন্তু সেখানে রোগীর চাপ নেই তেমন। রোগীর বেশি চাপ রয়েছে খুলনায়।
খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক রাশেদা সুলতানা বলেন, খুলনার করোনা হাসপাতাল এখন ১৩০ শয্যায় উন্নীত করা হয়েছে। রোগীদের সেবায় এ জেলায় মোট ২০০ শয্যার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
তিনি সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি যথাযথভাবে মেনে চলার জানিয়ে বলেন, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার জন্য মানুষকে প্রতিনিয়ত সচেতন করা হচ্ছে। মাস্ক ছাড়া বাড়ির বাইরে বের না হওয়ার জন্য বলা হয়েছে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কোনো বিকল্প নেই।
এক সপ্তাহের কঠোর লকডাউন
করোনা সংক্রমণ ও মৃত্যুহার আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় খুলনায় আগামী মঙ্গলবার (২২ জুন) থেকে এক সপ্তাহের কঠোর লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছে। শনিবার দুপুরে জেলা করোনাভাইরাস প্রতিরোধ কমিটির সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ সময় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, কাঁচামাল ও ওষুধ বহনকারী যানবাহন ছাড়া কোনও গণপরিবহন খুলনায় প্রবেশ করতে বা বের হতে পারবে না।
জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত সভায় জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হেলাল হোসেন বলেন, ‘কঠোর লকডাউন চলাকালে খুলনা মহানগর ও জেলায় গণপরিবহন সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে। শুধু ওষুধ এবং জরুরি কাঁচামাল ব্যতীত সব দোকানপাট এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে। কঠোর লকডাউনের বিধিনিষেধ বাস্তবায়নে জেলা প্রশাসন, পুলিশ, র‌্যাব, জনপ্রতিনিধি ও রাজনীতিকরা একসঙ্গে কাজ করবেন।’
তিনি আরও জানান, খুলনা জেনারেল হাসপাতালকে ৭০ শয্যার করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতালে রূপান্তরিত করা হয়েছে। এটি আগামী রবিবার থেকে চালু হবে। করোনা শনাক্তের নমুনা পরীক্ষার সংখ্যা বৃদ্ধি করা হবে। কঠোর লকডাউন বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য শিগগিরই গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে সবাইকে অবহিত করা হবে। মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করতে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে জরিমানা আদায়, স্বাস্থ্যবিধি পালনে মনিটরিং জোরদার করা এবং প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের না হতে প্রচার-প্রচারণা চলমান থাকবে।
জেলা প্রশাসকের সভাপতিত্বে সভায় জুম প্ল্যাটফর্মে সংযুক্ত ছিলেনÑ মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব (সমন্বয় ও সংস্কার) মো. কামাল হোসেন, খুলনার বিভাগীয় কমিশনার মো. ইসমাইল হোসেন, বিভাগীয় স্বাস্থ্য দফতরের পরিচালক ডা. রাশেদা সুলতানা ও সিভিল সার্জন ডা. নিয়াজ মোহাম্মদ।
সভায় খুলনার অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম) এসএম ফজলুর রহমান, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মাহবুব হাসান, খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. মো. রবিউল হাসান, মেডিক্যাল কলেজের উপাধ্যক্ষ ডা. মেহেদী নেওয়াজ, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক মো. ইকবাল হোসেন, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. ইউসুপ আলী, মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পদক এমডিএ বাবুল রানা, ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. শেখ মোহাম্মদ কামাল হোসেন, খুলনা প্রেস ক্লাবের সভাপতি এসএম জাহিদ হোসেন, সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি মুন্সি মো. মাহবুব আলাম সোহাগ, জেলার সরকারি কর্মকর্তা, কমিটির সদস্যসহ গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।