চলে গেলেন দেশবরেণ্য গণসংগীত শিল্পী ফকির আলমগীর

0
9

সৈয়দ ফারুক হোসেন :
করোনাভাইরাসের কাছে হার মেনে অবশেষে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চিরতরে চলে গেলেন কিংবদন্তি গণসংগীতশিল্পী ফকির আলমগীর। দেশবরেণ্য গণসংগীত শিল্পী ও বীর মুক্তিযোদ্ধা ফকির আলমগীর ছিলেন দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সাথে সংশ্লিষ্ট। মহামারী করোনা কেড়ে নিয়ে গিয়েছে একাত্তরের কণ্ঠযোদ্ধা, কিংবদন্তী গণসংগীতের এই শিল্পীকে। তিনি স্ত্রী, তিন ছেলে ও অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। কিছুদিন ধরে তিনি জ্বর ও খুসখুসে কাশিতে ভুগছিলেন। চিকিৎসকের পরামর্শমতো তাঁর কোভিড-১৯ পরীক্ষা করা হয়। এতে তাঁর করোনা পজিটিভ ধরা পড়ে। সেদিনই তার শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। অবশেষে ২৩ জুলাই শুক্রবার রাত ১০টা ৫৬ মিনিটে ৭১ বছর বয়সে তিনি শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।
স্বাধীনতার পর পাশ্চাত্য সংগীতের সঙ্গে দেশজ সুরের মেলবন্ধন ঘটিয়ে বাংলা পপ গানের বিকাশে ভূমিকা রাখেন শিল্পী ফকির আলমগীর। দীর্ঘদিনের সম্পৃক্ততায় তাঁর বেশ কিছু গান তুমুুল জনপ্রিয়তা পায়। এর মধ্যে ও সখিনা, নাম তার ছিলো জন হেনরিসহ আরো কিছু গান। ফকির আলমগীর ১৯৫০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনের স্মরণীয় দিনটিতে ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গা থানার কালামৃধা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা মো. হাচেন উদ্দিন ফকির, মা বেগম হাবিবুন্নেসা। তিনি কালামৃধা গোবিন্দ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৬৬ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে দেশের ঐতিহ্যবাহী জগন্নাথ কলেজে ভর্তি হন। এরপর স্নাতক পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে, সাংবাদিকতায় এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৮২ সালের বিটিভির ‘আনন্দমেলা’ অনুষ্ঠানে গান প্রচারের পর দর্শকের মধ্যে সাড়া পড়ে। তখন থেকেই তিনি নিয়মিত সংগীত পরিবেশন করতে থাকেন।
তিনি সাংস্কৃতিক সংগঠন ঋষিজ শিল্পীগোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাতা, গণসংগীত চর্চার আর এক সংগঠন গণসংগীতশিল্পী পরিষদের সাবেক সভাপতি। দেশের গণসংগীত প্রচার ও প্রসারে তার অবদান অসামান্য। ফকির আলমগীর স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অন্যতম শিল্পী। তারও আগে থেকে তিনি শ্রমজীবী মানুষের জন্য গণসংগীত করে আসছিলেন। স্বাধীনতার পর পাশ্চাত্য সংগীতের সঙ্গে দেশজ সুরের মেলবন্ধন ঘটিয়ে বাংলা পপ গানের বিকাশে ভূমিকা রেখেছেন ফকির আলমগীর। সংগীতে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য সরকার ১৯৯৯ সালে একুশে পদকে ভূষিত করেন। শিশু পার্কের সামনে বৈশাখী অনুষ্ঠানে তিনি ষাটের দশক থেকে গণসঙ্গীত গেয়ে আসছিলেন। গান গাওয়ার পাশাপাশি বংশীবাদক হিসেবে তাঁর খ্যাতি আছে। বাংলাদেশের সব ঐতিহাসিক আন্দোলনে তিনি তাঁর গান দিয়ে মানুষকে উজ্জীবিত করেছেন। ১৯৬৬ সালে ছাত্র ইউনিয়নের সক্রিয় সদস্য ছিলেন। এরই ধারাবাহিকতায় ক্রান্তি শিল্পীগোষ্ঠী ও গণশিল্পীগোষ্ঠীর সদস্য হিসেবে ষাটের দশকে বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে এবং ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে গণসংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে দেশস্বাধীনের সংগ্রামে ভূমিকা পালন করেন। গণঅভ্যুত্থান, ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ ও ৯০-এর সামরিক শাসনবিরোধী গণ-আন্দোলনে তিনি শামিল হয়েছিলেন তাঁর গান নিয়ে। যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে সঞ্চিত যন্ত্রণাকে প্রকাশ করার জন্যই দেশজ সংগীতের সঙ্গে পাশ্চাত্য সুরের মেলবন্ধন ঘটিয়ে তিনি ও তাঁর সময়ের কয়েকজন শিল্পী শুরু করেছিলেন প্রথম বাংলা পপ ধারার গান। বাংলা পপ গানের বিকাশেও তাঁর রয়েছে বিশেষ অবদান। ফকির আলমগীর (২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫০-২৩ জুলাই ২০২১) ছিলেন বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত দেশজ, লোকজ সঙ্গীত শিল্পী। গণসঙ্গীত ও দেশীয় পপ সঙ্গীতে তার ব্যাপক অবদান ছিল। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে শিল্পী একজন শব্দ সৈনিক হিসেবে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে যোগ দেন। ‘মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও বিজয়ের গান’, ‘গণসংগীতের অতীত ও বর্তমান’, ‘আমার কথা’, ‘যারা আছেন হৃদয় পটে’সহ বেশ কয়েকটি বই প্রকাশিত হয়েছে তার। দীর্ঘদিনের কর্মযজ্ঞে তাঁর কণ্ঠের বেশ কয়েকটি গান দারুণ জনপ্রিয়তা পায়। ফকির আলমগীর গানের পাশাপাশি নিয়মিত লেখালেখিও করেন। সংগীতের ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য এ পর্যন্ত পেয়েছেন রাষ্ট্রীয় ‘একুশে পদক’, ‘শেরেবাংলা পদক’, ‘ভাসানী পদক’, ‘সিকোয়েন্স অ্যাওয়ার্ড অব অনার’, ‘তর্কবাগীশ স্বর্ণপদক’, ‘জসীমউদ্?দীন স্বর্ণপদক’, ‘কান্তাকবি পদক’, ‘গণনাট্য পুরস্কার’, ‘পশ্চিমবঙ্গ সরকার কর্তৃক মহাসম্মাননা’, ‘ত্রিপুরা সংস্কৃতি সমন্বয় পুরস্কার’, ‘ঢালিউড অ্যাওয়ার্ড যুক্তরাষ্ট্র’, ‘জনসংযোগ সমিতি বিশেষ সম্মাননা’, ‘চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ড বিশেষ সম্মাননা’ ও ‘বাংলা একাডেমি সম্মানসূচক ফেলোশিপ’।
তাঁর অবদান এদেশের মানুষ চিরদিন স্মরণ রাখবে। মহান মুক্তিযুদ্ধ ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তার অবদান অবিস্মরণীয়। গণমানুষের শিল্পী ফকির আলমগীর গণমানুষের হৃদয়ের মণিকোঠায় বেঁচে থাকবেন। তার মতো একজন দেশপ্রেমিকের চলে যাওয়া জাতির জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। কিংবদন্তি এই শিল্পীর মৃত্যু বাংলাদেশের গণসংগীতের জন্য এক অপূরনীয় ক্ষতি। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির দেশের শিল্পঙ্গনে অবদান সংগীত জগত ও দেশের মানুষ চিরদিন মনে রাখবে। বাংলাদেশের সব ঐতিহাসিক আন্দোলন সংগ্রামে তিনি তার গান দিয়ে সাধারণ মানুষকে উজ্জীবিত করেছেন। ফকির আলমগীর ক্রান্তি শিল্পী গোষ্ঠী ও গণশিল্পী গোষ্ঠীর সদস্য হিসেব ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে যোগ দেন। ১৯৭১ সালে তিনি যোগ দেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে। ঋষিজ শিল্পীগোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাতা তিনি। তিনি দেশের সংগীত অঙ্গনে কতটা অবদান রেখেছেন, তা বলে শেষ করা যাবে না। তিনি যত বড়মাপের শিল্পী ছিলেন, তত বড় মনের মানুষ ছিলেন। ফকির আলমগীরের তুলনা চলে শুধু তার সঙ্গেই। সবচেয়ে বড় যে পুরস্কার ফকির আলমগীর জীবদ্দশায় পেয়েছেন, তা হচ্ছেÑ কয়েক প্রজন্মের বাঙালি শ্রোতার অকৃত্রিম ভালোবাসা। আগামী বহু প্রজন্ম ফকির আলমগীরের গানে উদ্বেলিত হবে। আজম খান, ফিরোজ সাঁই আর ফেরদৌস ওয়াহিদের সঙ্গে ফকির আলমগীরও তখন পপ গানে উন্মাদনা ছড়িয়েছিলেন শ্রোতাদের মাঝে। নেলসন ম্যান্ডেলাকে নিয়ে গান গেয়েছিলেন বাংলাদেশের গায়ক ফকির আলমগীর। গানটি লিখেছিলেন সেজান মাহমুদ। এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে নানা বার্তায় শোক জানাচ্ছেন সংগীতপ্রেমীরা। তার রুহের মাগফিরাত কামনা করা হচ্ছে সেসব পোস্টে। অনেকেই আবেগে লিখেছেন, সখিনার প্রেমে অমর হয়ে থাকবেন ফকির আলমগীর। সংগীত ভূবনের এই ‘রিকশাচালক’কে আর দেখা যাবে না। ফকির আলমগীরের কালজয়ী গান ‘ও সখীনা গেছস কি না ভুইলা আমারে’ শোনেনি বা জানে না এমন কেউ নেই। গানে গানে আজীবন অন্যায়-অনিয়মের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন ফকির আলমগীর। তার এই বিশেষত্বই দেশের মানুষের হৃদয়ে স্থান করে দিয়েছে তাঁকে। তিনি গাইতেন মানুষের জন্য, দেশের জন্য। মানবতার কথা, বঞ্চিত মানুষের অধিকারের কথা নিয়েই গানে গানে হাজির হতেন এ গণসংগীতশিল্পী। তাঁর কণ্ঠস্বর গ্রামে-গঞ্জে, মাঠে-ঘাটে মানুষের মুখে মুখে উচ্চারিত হয়। এসব গানের মধ্যে অন্যতম মায়ের এক ধার দুধের দাম, নাম তার ছিল জন হেনরি, নেলসন ম্যান্ডেলা বেশ জনপ্রিয়। মায়ের এক ধার দুধের দাম গানটি মা দিবসে গাওয়া না হলে যেন অসম্পূর্ণ থেকে যায় মা দিবস। মে দিবসে ফকির আলমগীরের গাওয়া সেই গানটি বাজান অনেকে Ñ ‘নাম তার ছিল জন হেনরি, ছিল যেন জীবন্ত ইঞ্জিন, হাতুড়ির তালে তালে গান, গেয়ে খুশি মনে কাজ করে রাতদিন, কালো পাথরে খোদাই জন হেনরী, গ্রানাইট পেশি গড়া ঝলমল, হাতুড়ির ঘায়ে ঘায়ে পাথরে আগুন ধরে, হাতুড়ি চালানো তার সম্বল, কালো কালো মানুষের দেশে, ঐ কালো মাটিতে, রক্তের স্রোতের শামিল, নেলসন ম্যান্ডেলা তুমি অমর কবিতার অন্ত্যমিল, তোমার চোখেতে দেখি স্বপ্ন-মিছিল, অগুন্তি মানুষের হৃদয়ের মিল। পৃথিবীর বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের পুরোধা নেলসন ম্যান্ডেলাকে নিয়ে ১৯৮৯ সালে এই অসাধারণ গানটি কণ্ঠে তোলেন ফকির আলমগীর। গানটি বেশ জনপ্রিয়তা পায়। বাংলাদেশ সফরে আসার পর স্বয়ং নেলসন ম্যান্ডেলাও গানটি শুনে মুগ্ধ হন।
গণসঙ্গীত ও দেশীয় পপ সঙ্গীতে তার ব্যাপক অবদান তার। আমৃত্যু বঞ্চিত মানুষের পক্ষে গান গেয়ে গেছেন এই গণসংগীত শিল্পী। তিনি কলামিষ্ট ও লেখক হিসেবেও পরিচিত ছিলেন। তিনি তাঁর রচিত ‘আমার কথা’ গ্রন্থে লিখেছেন, “এক নাগরিক কবিয়াল আমি। নিভৃত পল্লীর মাটি, মানুষ, ফসলের সোহাগী সৌরভ কপালে মেখে আজকের আমি উঠে এসেছি নাগরিক রাজপথে। দুনিয়ার দেশে দেশে বাঙালি যেখানে, সেখানেই ঘুরে বেড়িয়েছি একতারা হাতে আর জাতীয় পতাকা কাঁধে। সুরে, শিহরণে ছড়িয়ে দিয়েছি আউল-বাউল ভালোবাসা। গানে গানে বলেছি অবহেলিত, লাঞ্ছিত জীবনের বেদনার আর্তি আর সম্ভাবনার কথা। মরমি উপলব্ধিতে লোকায়ত বাংলার সখিনাদের কথকতা, গীত-গাঁথা তুলে ধরার চেষ্টা করেছি দরাজ দরদি কণ্ঠে।”
সশ্রদ্ধ সালাম হে শিল্পী,্ ওপারে ভালো থেকো।
লেখক : ডেপুটি রেজিস্ট্রার, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়