চলে গেলেন বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু সায়মন ড্রিং

0
20

সৈয়দ ফারুক হোসেন

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সেই অকৃত্রিম বন্ধু সায়মন ড্রিং ১৬ জুলাই মারা গেলেন। মৃত্যুর সময় তার বয়স হয়েছিল ৭৬ বছর। ব্রিটিশ সাংবাদিক সায়মন ড্রিং ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধে পাকিস্তানের ভয়াবহতা এবং নৃশংসতা বিশ্ববাসীকে জানিয়েছিলেন। সায়মন ড্রিং বাংলাদেশের গণহত্যার প্রত্যক্ষদর্শী প্রথম বিদেশি সাংবাদিক যিনি নিজের জীবন বিপন্ন করে সরেজমিন প্রতিবেদন তৈরি করে সারা বিশ্বকে জানিয়ে দেন পাকিস্তানি বাহিনীর লোমহর্ষক নির্যাতন ও গণহত্যার কথা। তাই তিনি বাংলাদেশের জনগণের কাছে একজন হিরো ছিলেন। ভিয়েতনাম যুদ্ধ এবং বাংলাদেশের গণহত্যার ওপর প্রস্তুতকৃত প্রতিবেদন তাকে বিশ্বজোড়া খ্যাতি ও সুনাম এনে দেয়। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তিনি পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর জঘন্য ও নৃশংসতার বিবরণ তুলে ধরেছিলেন বিশ্ব দরবারে। গত শুক্রবার রোমানিয়ার একটি হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের সময় সায়মন ড্রিংয়ের মৃত্যু হয় বলে জানা যায়। ইতিহাস সাক্ষী; মুক্তিযুদ্ধে সায়মন ড্রিং-এর অবদান ভোলার নয়। তাকে বাংলাদেশ থেকে সম্মানসূচক নাগরিকত্ব দেওয়া হয়েছিল। ভারতে মার্ক টালি যেমন, সাইমন ড্রিং বাংলাদেশের কাছে সেরকমই একজন ছিলেন। সায়মন ড্রিং ছিলেন অকুতোভয় এবং মেধাবী একজন সাংবাদিক। তিনি বিবিসি, রয়টার্স, টেলিগ্রাফ ও ওয়াশিংটন পোস্টে কাজ করেছেন। সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবে অনেকগুলো আন্তর্জাতিক পুরস্কারও পেয়েছেন। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হলÑ ইন্টারন্যাশনাল রিপোর্টার অব দ্য ইয়ার-১৯৭১। একাত্তরে পাকিস্তানি বাহিনীর বাঙালি গণহত্যার খবর বিবিসির মাধ্যমে সর্বপ্রথম তিনিই প্রকাশ করেছিলেন। একাত্তরে পাকিস্তানি বাহিনীর নিধনযজ্ঞের খবর যিনি সবার আগে পৌঁছে দিয়েছিলেন বিশ্বের কাছে, সেই বিখ্যাত ব্রিটিশ সাংবাদিক, বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু সায়মন ড্রিং যিনি মরেও অমর হয়ে থাকবেন বাঙালি জাতির কাছে। চলতি শতকের গোড়ায় বাংলাদেশের প্রথম বেসরকারি টেরেস্ট্রিয়াল টেলিভিশন স্টেশন একুশে টেলিভিশনের যাত্রা শুরুর সময় সাইমন ড্রিংয়ের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। বলা হয়, তার হাত ধরে এ দেশে টেলিভিশন সাংবাদিকতা নতুন মাত্রা পায়। একাত্তরে বাংলাদেশের মানুষের পাশে দাঁড়ানো এই ব্রিটিশ সাংবাদিককে ২০১২ সালে মুক্তিযুদ্ধ সম্মাননায় ভূষিত করে বাংলাদেশ সরকার। রয়টার্স, টেলিগ্রাফ ও বিবিসির হয়ে সাইমন ড্রিং দীর্ঘদিন কাজ করেছে বৈদেশিক সংবাদদাতা, টেলিভিশন উপস্থাপক এবং তথ্যচিত্র নির্মাতা হিসেবে। ১৯৪৫ সালের ১১ জানুয়ারিতে ইংল্যান্ডের নরফোকে জন্ম নেওয়া সায়মন ড্রিং সাংবাদিকতা শুরু করেন ১৮ বছর বয়স থেকে। দেখেছেন ২২টি যুদ্ধ, অভ্যুত্থান ও বিপ্লব। যুদ্ধক্ষেত্রের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে আহতও হয়েছেন একাধিকবার। স্বাধীনতার ৪০ বছর পর ঢাকায় এসে সায়মন ড্রিং আবারও তার স্মৃতিময় স্থানগুলো ঘুরে দেখেন, যা নিয়ে সে সময় একটি প্রামাণ্যচিত্রও তৈরি হয়। ২০১২ সালে সোনারগাঁও হোটেলে স্মৃতি ৭১ শিরোনামে এক অনুষ্ঠানে সেইসব দিনের গল্প শুনিয়েছিলেন সায়মন ড্রিং। বলেছিলেন, ৪০ বছর পেরিয়ে গেলেও যুদ্ধাপরাধের বিচার দরকার। সেই অনুষ্ঠানে আরও ছিলেন ব্রিটিশ সাংবাদিক মার্ক টালি, যিনি একাত্তরে বিবিসির দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সংবাদদাতা ছিলেন। তাদের দু’জনকেই মুক্তিযুদ্ধ সম্মাননায় ভূষিত করেছে বাংলাদেশ সরকার। বিশ্বভ্রমণের নেশায় ১৯৬২ সালে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েন সায়মন ড্রিং, তখন তার বয়স মাত্র ১৭ বছর, লেখাপড়া করেন কিংস লিন টেকনিক্যাল কলেজে। ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশ এবং ভারতেও সে সময় তার পা পড়ে। ১৯৬৩ সালে থাইল্যান্ডের ব্যাংকক ওয়ার্ল্ড সংবাদপত্রে ফিচার রাইটার হিসেবে সায়মন ড্রিংয়ের সাংবাদিকতার শুরু। পরে লাওস থেকে যুক্তরাজ্যের ডেইলি মেইল আর যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক টাইমসের জন্য তিনি ফ্রিল্যান্স কাজ শুরু করেন। রয়টার্সের হয়ে যুদ্ধের খবর সংগ্রহ করতে ১৯৬৪ সালে তিনি চলে যান ভিয়েতনামে। তিনিই তখন রয়টার্সের সর্বকনিষ্ঠ বৈদেশিক সংবাদদাতা। এরপর ১৯৭০ এবং ১৯৮০-এর দশক জুড়ে তিনি ডেইলি টেলিগ্রাফ, বিবিসি টেলিভিশন, বিবিসি রেডিও, সানডে টাইমস, নিউজইউকের হয়ে কাজ করেছেন। দক্ষিণ এশিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ছাড়াও ইউরোপ, আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য আর লাতিন আমেরিকার বহু দেশ তিনি সে সময় চষে বেড়িয়েছেন খবরের পেছনে। ইরানের শাহবিরোধী বিপ্লবের সময় সায়মন ড্রিংয়ের বিভিন্ন প্রতিবেদন দারুণ সাড়া জাগায়, সেজন্য বিভিন্ন পুরস্কারও তিনি পেয়েছেন। সেই বিপ্লবে রেজা শাহ পাহলভী ক্ষমতাচ্যুত হলে যে বিমানে করে আয়াতুল্লাহ খোমেনি প্যারিস থেকে তেহরানে পৌঁছেছিলেন, সেই বিমানে সায়মন ড্রিং-ও ছিলেন। উগান্ডায় ইদি আমিনের সময় মৃত্যুদন্ডের হুমকিও পেতে হয়েছিল এই ব্রিটিশ সাংবাদিককে। আফ্রিকার দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের সহায়তায় তহবিল সংগ্রহের কাজেও নিজেকে যুক্ত করেছেন তিনি। সায়মন ড্রিং ৪৭ বছর বয়সে বিবিসি রেডিও ফোরের ‘অন দ্য রোড এগেইন’ শিরোনামে একটি সিরিজের জন্য তার কৈশোরের সফরের পথ ধরে আবারও বেরিয়ে পড়েন ১৮ হাজার মাইলের দীর্ঘ ভ্রমণে। পরে ১৯৯৪ সালে সেই ভ্রমণ নিয়ে একই নামে আট পর্বের ডকুমেন্টারি নির্মাণ করেন, যা বিবিসি টেলিভিশন এবং ডিসকভারিতে প্রচার করা হয়। ১৯৯৫ সালে ‘অন দ্য রোড এগেইন: থার্টি ইয়ার্স অন দ্য ট্র্যাভেলার্স ট্রেইল টু ইন্ডিয়া’ নামে একটি বইও লেখেন ড্রিং, যা প্রকাশ করে বিবিসি বুকস। ১৯৭১ সালের শুরুর দিকে সায়মন ড্রিং ডেইলি টেলিগ্রাফের হয়ে কাজ করছিলেন কম্বোডিয়ায়। মার্চে লন্ডনের হেডঅফিস থেকে তাকে পূর্ব পাকিস্তানে যেতে বলা হল, কারণ ঢাকার রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত, সম্ভবত বড় কিছু ঘটতে যাচ্ছে। সেই খবর সংগ্রহ করতে ৬ মার্চ ঢাকায় আসেন সায়মন ড্রিং। পরদিন ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক সেই ভাষণও তিনি প্রত্যক্ষ করেন। বাংলা না জানায় সেই ভাষণের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে না বুঝলেও লাখো জনতার চোখের ভাষায় তিনি ঠিকই বুঝেছিলেন, সত্যিই বড় কিছু ঘটতে যাচ্ছে। সায়মন ড্রিং ঢাকায় এসেছিলেন সপ্তাহখানেকের সময় নিয়ে। কিন্তু পরিস্থিতি দেখে তিনি থেকে গেলেন। বঙ্গবন্ধুসহ আওয়ামী লীগের অনেক নেতার সঙ্গে পরিচয় হল। তখনকার পূর্ব পাকিস্তানের বিস্ফোরন্মুখ পরিস্থিতির খবর তিনি নিয়মিত পাঠাতে লাগলেন লন্ডনে। ২৫ মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী গণহত্যা শুরু করার আগে ঢাকায় অবস্থানরত প্রায় অর্ধশত বিদেশি সাংবাদিককে আটকে ফেলে তখনকার হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে। পরদিন তাদের হোটেল থেকে সরাসরি বিমানে তুলে ঢাকা ছাড়তে বাধ্য করা হয় যাতে গণহত্যার কোনো খবর সংগ্রহ করতে না পারে বিশ্ব গণমাধ্যমের জন্য। সায়মন ড্রিং ওই হোটেলেই ছিলেন। পাকিস্তানিদের নির্দেশ না মেনে প্রাণের ঝুঁঁকি নিয়ে তিনি লুকিয়ে পড়েন। শ্বাসরুদ্ধকর ৩২ ঘণ্টা সময় কাটে হোটেলের লবি, ছাদ, বার, কিচেনের মত জায়গায়। ২৭ মার্চ কারফিউ উঠে গেলে সায়মন ড্রিং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হল, রাজারবাগ পুলিশ লাইনস, পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকাসহ ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর বাড়ি ঘুরে দেখেন। পরে তিনি সবগুলো বিষয়ের ঘটনা নোটবুকে তুলে নিয়ে থাইল্যান্ডে চলে যান। ধ্বংসযজ্ঞের সেই প্রত্যক্ষ চিত্র তুলে ধরে ৩০ মার্চ ডেইলি টেলিগ্রাফে প্রকাশিত হয় সায়মন ড্রিংয়ের প্রতিবেদন ‘ট্যাংকস ক্রাশ রিভল্ট ইন পাকিস্তান’। সেটাই ছিল আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ইংরেজি ভাষায় পাকিস্তানি গণহত্যার প্রথম বিবরণ। তিনি লিখেছিলেন, “আল্লাহর নামে আর অখন্ড পাকিস্তান রক্ষার অজুহাতে ঢাকা আজ ধ্বংসপ্রাপ্ত এক সন্ত্রস্ত নগর।” ওই প্রতিবেদন প্রকাশের পর লন্ডনে ফিরে গেলেও ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত জেনে আবার তিনি ঢাকায় আসেন। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দিনও তিনি ঢাকায় ছিলেন। সাইমন ড্রিং আবার বাংলাদেশে আসেন ১৯৯৭ সালে। এ দেশের প্রথম বেসরকারি টেরিস্ট্রিয়াল টেলিভিশন চ্যানেল একুশে টিভি গড়ার প্রধান কারিগর ছিলেন তিনি। একুশে টিভির ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে অর্ধশতাধিক সাংবাদিক, প্রযোজক এবং সম্পাদক নিয়ে তিনি কাজ শুরু করেছিলেন। আর তার সুবাদেই পাল্টে গিয়েছিল বাংলাদেশের মানুষের টেলিভিশন সংবাদ দেখার অভিজ্ঞতা। অল্প সময়ের মধ্যে একুশে টেলিভিশন পৌঁছে যায় জনপ্রিয়তার তুঙ্গে। ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর একুশে টিভি বন্ধ করে দেওয়া হয়। সে সময় একুশে টেলিভিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, সংবাদমাধ্যম হিসেবে তাদের নিরপেক্ষ অবস্থান ক্ষমতাসীন দলের পছন্দ হয়নি। পরের বছর অক্টোবরে তখনকার প্রশাসন সায়মন ড্রিংয়ের ভিসা ও ওয়ার্ক পারমিট বাতিল করে তাকে বাংলাদেশ ত্যাগে বাধ্য করে। চলে যাওয়ার আগে এক বিদায় অনুষ্ঠানে দেশের সাংস্কৃতিক ও গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের সামনে সায়মন ড্রিং বলেছিলেন, ‘এ নিয়ে দ্বিতীয়বারের মত তাকে বাংলাদেশ থেকে ‘বের করে’ দেওয়া হল। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরে মুক্তিযুদ্ধের বিদেশি বন্ধুদের সম্মাননা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে ২০১২ সালের মার্চে আবার বাংলাদেশ আসেন সায়মন ড্রিং। পরে তিনি কিছুদিন যমুনা টেলিভিশনের উপদেষ্টা হিসেবেও কাজ করেছেন। বিদায় বন্ধু, ওপারে ভালো থেকো।