টিকা দেয়া শুরু কাল থেকে

0
0

নিজস্ব প্রতিবেদক
করোনা টিকা দেয়া শুরু হচ্ছে আজ বুধবার । ইতোমধ্যে সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে প্রথম একজন নার্সের শরীরে প্রয়োগের মধ্য দিয়ে দেশে টিকা কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে।
ভার্চুয়ালি যুক্ত থেকে এ কার্যক্রমের উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
মঙ্গলবার কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে টিকাদান কার্যক্রম শুরুর প্রস্তুতি পরিদর্শন করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক।
এ সময় তিনি সাংবাদিকদের বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বেলা সাড়ে ৩টায় ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে টিকাদান কার্যক্রমের উদ্বোধন করবেন। তিনি ভিডিও কনফারেন্সেই প্রথম ৫ জনের ওপর টিকার প্রয়োগ সরাসরি প্রত্যক্ষ করবেন।
কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জামিল আহমদ হাসপাতালের প্রস্তুতি নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিকাল ৩টায় প্রাথমিক ড্রাই রান করা হবে। এছাড়াও হাসপাতালের চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মীসহ প্রায় ১০০ জনকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
এ কর্মসূচি আরও গতি পাবে এদিনই এই হাসপাতালে সম্মুখ সারিতে থাকা বিভিন্ন পেশার প্রতিনিধিত্বকারী ২৪ জনের একটি দলকে টিকা দেয়ার মাধ্যমে। সেই তালিকায় চিকিৎসক, নার্স, মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষক, পুলিশ, সেনাবাহিনী, সাংবাদিকসহ অন্য পেশার মানুষ যুক্ত থাকবে।
আর পরদিন ২৮ জানুয়ারি এই হাসপাতালের সঙ্গে আরও চারটি হাসপাতালে করোনার টিকা প্রয়োগ শুরু হবে। এগুলো হচ্ছে- ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, মুগদা জেনারেল হাসপাতাল, কুয়েত মৈত্রী জেনারেল হাসপাতাল ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়।
এই পাঁচ হাসপাতালের পাঁচ পরিচালক গণমাধ্যমকে বলেন, তারা টিকা কর্মসূচি চালু করতে প্রস্তুত।
এসব হাসপাতালের ৪০০ থেকে ৫০০ জন স্বাস্থ্যকর্মীদের টিকা দিয়েই এ কার্যক্রম শুরু হবে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য সচিব আব্দুল মান্নান। তিনি বলেছেন, ‘এরপর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রটোকল অনুযায়ী তাদের পর্যবেক্ষণ করা হবে, তাদের মধ্যে কোনও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হয় কিনা সেটা দেখা হবে।’
গত ২০ জানুয়ারি ভারত সরকারের উপহার দেওয়া অক্সফোর্ড অ্যাস্ট্রাজেনেকার তৈরি কোভিশিল্ড টিকা দেশে এসে পৌঁছায়। সোমবার দেশে এসে পৌঁছেছে সরকারের কেনা তিন কোটি টিকার প্রথম চালান ৫০ লাখ ডোজ।
এই ৭০ লাখ টিকার ভেতরে ৬০ লাখ টিকা দেয়া হবে প্রথম মাসে, দ্বিতীয় মাসে দেয়া হবে ৫০ লাখ, তৃতীয় মাসে দেয়া হবে আবার ৬০ লাখ। প্রথম মাসে টিকা পাওয়াদের দ্বিতীয় ডোজ দেয়া হবে তৃতীয় মাসে। আর এ হিসাবে টিকা বিতরণ পরিকল্পনা ইতোমধ্যে করা হয়েছে। কেনা টিকা দেশে আসার পর ঢাকা থেকে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস চুক্তি অনুযায়ী দেশের বিভিন্ন জেলাতে টিকা পৌঁছে দেবে।
টিকা নেয়ার প্রস্তুতি মোটামুটি ভালোই, সবকিছু প্রস্তুত হচ্ছে মন্তব্য করেছেন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাজমুল হক।
টিকা নেয়ার জন্য কতজন স্বাস্থ্যকর্মী প্রস্তুত করা হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এখনও সেভাবে ফাইনাল করিনি, তবে পরিকল্পনা রয়েছে ১০০ জনের মতো স্বেচ্ছাকর্মীকে দিতে পারা, সেভাবেই প্রস্তুতি নিচ্ছি।’ আমাদের অনেক চিকিৎসক আগ্রহী প্রথম দিনেই টিকা নিতে।’
তিনি বলেন, ‘তবে আমি নিজে হাসপাতালের পরিচালক হিসেবে প্রথম টিকা নিতে আগ্রহীÑ আমার কলিগদের টিকা নিতে উদ্বুদ্ধ করতে, উৎসাহ দেওয়ার জন্য, আস্থা জোগাতে।’
এ হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স, ওয়ার্ডবয়, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, টেকনোলজিস্ট,আনসারসহ সব বিভাগের প্রতিনিধিদের মাধ্যমে এই ১০০ জনকে বাছাই করা হয়েছে।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের নিচতলাতে ভ্যাকসিন নেওয়ার জন্য বুথ করা হয়েছে।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাজমুল হক বলেন, এখানে টিকা দেয়ার পর পর্যবেক্ষণ করা হবে। সেজন্য ‘পোস্ট ভ্যাকসিন এরিয়া’ প্রস্তুত করা হয়েছে, সেখানে পর্যবেক্ষণ করা হবে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালক (হাসপাতাল) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জুলফিকার আমিন বলেন, ‘আমাদের প্রিপারেশন অলমোস্ট শেষ করে ফেলেছি। ২৪ জানুয়ারি এ হাসপাতালে এই টিকাদান কর্মসূচি কিভাবে পরিচালিত হবে সে বিষয়ে একটি সভা হয়।
তিনি জানান, সাধারণ মানুষের জন্য জাতীয়ভাবে টিকাদান কর্মসূচি চালু হলে তখন এ হাসপাতালে মোট আটটি বুথ থাকবে এবং প্রতিটি বুথে টিকা দেয়ার জন্য দুইজন নার্স এবং চারজন করে স্বেচ্ছাসেবক থাকবেন।
টিকা দেয়ার পর পোস্ট ওয়েটিং রুমে টিক গ্রহীতাদের জন্য জায়গা নির্ধারণ করা হয়েছে। সেখানে তারা ৩০ মিনিট পর্যবেক্ষণে থাকবেন। আর এই সময়ে তাদের পর্যবেক্ষণের জন্য থাকবে একটি মেডিকেল টিম এবং স্ট্যান্ডবাই আরেকটি মেডিকেল টিম থাকবে যেখানে একজন ইন্টারনাল মেডিসিন স্পেশালিস্ট, দুইজন রেসিডেন্স এবং একজন আইসিইউ স্পেশালিস্ট থাকবেন।
তিনি জানান, আটটি অবর্জারভেশন বেড প্রস্তুত করা হয়েছে জীবনরক্ষাকারী সব ধরনের ওষুধ এবং যন্ত্রপাতিসহ। সেখানে টিকা নেয়া ব্যক্তিদের পর্যবেক্ষণ করা হবে, আর এ সময়ে যদি কারও আরও অ্যাডভান্স ট্রিটমেন্টের প্রয়োজন হয় তাহলে হাসপাতালের সি ব্লকে ১০ তলায় চারটি শয্যা প্রস্তুত করা হয়েছে এইচডিইউ ( হাই ডিপেন্ডেন্সি ইউনিট) হিসেবে। আর এই কাজে একেবারেই একটি ডেডিকেটেড অ্যাম্বুলেন্সও রাখা হয়েছে।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জুলফিকার আমিন বলেন, এখন পর্যন্ত হাসপাতালের ৩০০ জনের বেশি চিকিৎসক টিকা নেয়ার জন্য আবেদন করে নিবন্ধন করেছেন যার তালিকা আমার কাছে রয়েছে। তবে নার্সদের, এমএলএসএস, আনসার এবং পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা যার যার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে আবেদন করছেন।
আমাদের পরিকল্পনা হচ্ছে, সব বিভাগ থেকেই কয়েকজন করে নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতরের বলা ২০০ জনের তালিকা করা হবে।
হাসপাতাল পরিচালক হিসেবে তিনি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কনক কান্তি বড়ুয়াও টিকা নিতে নিবন্ধন করেছেন।
তিনি বলেন, ‘আমি এবং ভিসি মহোদয় দুজনই টিকা।
মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. অসীম কুমার নাথ গণমাধ্যমকে বলেন, হাসপাতালের ভেতরে ভ্যাকসিনেশন সাইটে টিকা গ্রহীতাদের কিছু ভাইটাল বিষয়Ñ যেমন রক্তচাপ, ফুসফুসের অবস্থা এবং অ্যালার্জির কোনও সমস্যা রয়েছে কিনা তা যাচাই করে সব ঠিক থাকলে তাকে টিকা দেয়া হবে। টিকা দেয়ার পর পর্যবেক্ষণে রাখা হবে ৩০ মিনিট। আর তাদের দেখার জন্য থাকবে একটি মেডিকেল টিম। যদি কোনও সমস্যা না হয় তাহলে তারা বাসায় চলে যাবেন এবং তখন তাদের একটি টেলিমেডিসিনের জন্য ফোন নম্বর দেয়া হবে। যদি বাড়ি যাওয়ার পর কোনো সমস্যা হয় তখন ওই নম্বরে তিনি কল করে প্রয়োজনীয় সেবা নেবেন।
টিকা রাখার জন্য হাসপাতালে আইএলআর ( হিমায়িত বাক্সের মধ্যে টিকা সংরক্ষণের ব্যবস্থা) ফ্রিজ রয়েছে যেখানে তিন হাজার টিকা রাখার ব্যবস্থা আছে।
এ হাসপাতালে চিকিৎসক, নার্স, ওয়ার্ডবয়, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, নিরাপত্তারক্ষী, টেকনোলজিস্টসহ মোট ১ হাজার ৪৭ জন কর্মী রয়েছেন।
তাদের মধ্যে টিকা নেয়ার জন্য স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে ১০০ থেকে ১৫০ মানুষকে প্রস্তুত রাখতে বলা হয়েছে। এ হাসপাতাল থেকে ইতোমধ্যে ১০০ জনের একটি তালিকা অধিদফতরে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে।
ডা অসীম কুমার নাথ বলেন, ‘তবে আমরা যাদের বয়স ৫০ বছরের নিচে তাদেরকে প্রায়োরিটি দিতে চাইছি।’
বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী সরকারি হাসপাতালের পরিচালক ডা. এ কে এম সরয়ার উল আলম জানিয়েছেন, এ হাসপাতালের এ সংক্রান্ত প্রস্তুতি চলছে, এখনও ফাইনাল হয়নি। যারা টিকা দেবেন তাদের প্রশিক্ষণ চলছে। এ হাসপাতালে কারা টিকা নেবেন তাদের তালিকা হচ্ছে, যাচাই বাচাই চলছে।
কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জামিল আহমেদ গণমাধ্যমকে জানান, তার হাসপাতালে প্রস্তুতি শেষ।
তিনি বলেন, ‘আমরা পুরোপুরি প্রস্তুত। এ হাসপাতালের ১০০ জনের তালিকা তৈরি করা হয়েছে প্রথম দিনের জন্য, পাশাপাশি ৫০ জনের আরেকটি টিম স্ট্যান্ডবাই রাখা হয়েছে। কেবল ২৭ কিংবা ২৮ তারিখকে ধরে এই পরিকল্পনা নয়, এই পরিকল্পনা অনেক লম্বা, হয়তো এই টিকাদান কর্মসূচি চালাতে হবে অনেক দিন।’
জামিল আহমেদ বলেন, ‘পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া ম্যানেজমেন্ট টিম প্রস্তুত করা হয়েছে। গ্রহণকারীদের পর্যবেক্ষণে রাখার জন্য ২০টি শয্যা প্রস্তুত করা হয়েছে। সঙ্গে রাখা হয়েছে চার বেডের আইসিইউ ইউনিট। আশাকরি খুব একটা সমস্যা হবে না।’