নতুন বছরে বিশ্ব হোক করোনামুক্ত

0
6

অবশেষে দুই হাজার বিশ বিদয় হয়ে চলে গেল। আর এ বছরটি আমাদের মাঝে ফিরে আসবে না। কিন্তু যেসব স্মৃতি, যেসব দুঃখ গাঁথা আমাদের মাঝে রেখে গেল, তা ভুলবার নয়। অনেক পরিচিত বন্ধু, নিকটাত্মীয় যাঁদের আমরা হারিয়েছি তারা না ফেরার দেশে চলে গেছে মরণঘাতি করোনার ছোবলে। বলা যায় করোনাকালের বছর। নতুন একটি বছরের আগমন। ক্যালেন্ডারের পাতায় যোগ হলো নতুন পাতা। জগতের সবকিছুই নিয়মের অধীন। নিয়মব্যতীত কোনকিছুই চলে না, আর যা চলে তা প্রাণি নয়, জড়বস্তু। চন্দ্র-সূর্য নিয়ম মেনেই উদিত হয় এবং অস্ত যায়। নিয়মমাফিক দিন ও রাত হয়।

আমরা দেখেছি করোনাকালে পুলিশসহ বিভিন্ন মানবিক মানুষগুলো কিভাবে সকলের পাশে দাঁড়িয়েছে। করোনাকালের সেই মানবিকতা সকলের মধ্যে জাগ্রত হোক, দূর হোক সকল জরা-ব্যাধি। একটি সুন্দর লক্ষ্য চিহ্নিত করে আমরা নতুন উদ্যোমে যাত্রা শুরু করি। করোনাসহ সকল অমানবিকতার বিদায় জানিয়ে মানবিক বিশ্ব কামনায় জানাই শুভেচ্ছা।

সেই নিয়মের ধারাবাহিকতায় শেষ হচ্ছে একটি বছর। আসছে নতুন বছর দুই হাজার একুশ। নতুন মানেই আনন্দের-উচ্ছ্বাসের। আর পুরাতন অর্থই প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি ও যোগ-বিয়োগের। নতুন বছর শিশু শিক্ষার্থীদের কাছে নতুন বই পাওয়ার উৎসব। নতুন বছর তরুণ শিক্ষার্থীদের কাছে নতুন ক্লাসে ওঠার আনন্দ। নতুন বছর শিক্ষকের কাছে নতুন বই পড়ানোর আনন্দ। নতুন বছর চাকরিজীবীদের কাছে পদোন্নতি পাওয়ার আশ্বাস। বেতন বৃদ্ধির আশ্বাস। আর কৃষকের কাছে নতুন বছর নতুন ফসল ও ন্যায্য মজুরি পাওয়ার প্রত্যাশা। সকলের জীবনেই নতুন বছর অর্থই যেন নতুন প্রাপ্তি।

সবকিছুরই একটি লক্ষ্য আছে। আর লক্ষ্যকে নিয়েই গড়ে ওঠে প্রত্যাশার জায়গা। আমরা যে সবুজ-সোনালী শস্য-শ্যামলা বাংলাদেশে বাস করি এই অপরূপ দেশের প্রকৃতিরও একটি লক্ষ্য রয়েছে। বাংলাদেশে রয়েছে ছয়টি ঋতু। গ্রীষ্মকাল, বর্ষাকাল, শরৎকাল, হেমন্তকাল, শীতকাল ও বসন্তকাল। প্রত্যেকটি ঋতুরই কিন্তু একটি লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য আছে। যেমন গ্রীষ্মকাল এলেই আমরা গরম অনুভব করি। প্রকৃতিতে প্রখর সূর্যের তাপে বেড়ে যায় তাপমাত্রার ডিগ্রি। আম-জাম-কাঁঠাল পাকে। গ্রীষ্মের কথা ভাবতেই যেন মনে হয় কোন কোন ফল প্রকৃতিতে পাবো। আর সেসব ফলের মধুর রস পেতে আন-চান করে জিহ্বা।

তারপর আসে বর্ষা। বর্ষা মনে করতেই যেন বৃষ্টির আভাস মনে চলে আসে। চলে আসে কাদা-মাখা শৈশবের স্মৃতি। ধারাবাহিকভাবেই চলে শরৎ ও হেমন্ত। তারপর শীত মানেই যেন রুক্ষ ত্বক আর শীতল অনুভূতি। ছিন্নমূল মানুষের অসহায়ত্ব জীবন। শিশু ও বৃদ্ধদের কষ্টময় জীবন। তারপরই আসে বসন্ত। বসন্তে মনে আনে সতেজতার ছাপ। গাছে-গাছে নতুন পাতাÑ সবকিছু মিলিয়ে প্রকৃতি সাজে অপরূপ রূপে। তাই বসন্তকে বলা হয় ঋতুরাজ। যে কথাটি পূর্বে বলেছিলাম আর যে কারণে প্রকৃতির ঋতুর বর্ণনা।

আসলে আমাদের প্রত্যেকের জীবন সময়ে-নিয়মেই বাঁধা। আমরা কেউ ইচ্ছে করলেই কিন্তু পূর্বের জীবনে ফিরে যেতে পারি না। সেই কারণে প্রত্যেকেরই নির্দিষ্ট লক্ষ্য বা পরিকল্পনা নিয়ে জীবনকে সাজাতে হয়। আর পরিকল্পনাবিহীন জীবন নাবিকবিহীন জাহাজের মত। গল্পে পড়েছি নাবিকবিহীন জাহাজ কিন্তু সঠিক গন্তব্যে পৌঁছায় না বা সঠিকপথে চলে না। ঠিক মানবজীবনও তেমনি। লক্ষ্যটা ঠিক বা নির্দিষ্ট না হলে জীবনে কিন্তু সফলতার মুখ দেখা কঠিন। জাহাজের লাইন থেকে আমরা কিন্তু এমনটাই ইঙ্গিত পাই।

জীবনে চলার পথে সকলে যে সফল হয় তা কিন্তু নয়। আবার সকলে যে বিফলে যায় তা-ও কিন্তু নয়। তবে পরাজয়ের গ্লানি জয়ের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যায়। আমরা হয়তো রবার্ট ব্রুশের কাহিনী জানি। তিনি বার বার যুদ্ধে পরাজিত হয়েছিলেন শত্রুপক্ষের দ্বারা। এক পর্যায়ে তিনি আশাহত হয়েছিলেন। এমন সময় তিনি দেওয়ালে একটি মাকড়সাকে দেখলেন বার বার দেয়াল বেয়ে ওপরে ওঠার প্রচেষ্টা। সাত সাতবার মাকড়সাটি উঠতে ব্যর্থ হয়েছিল। কিন্তু মাকড়সাটি থেমে থাকেনি। অদম্য মনোবলের কারণে অষ্টমবার মাকড়সাটি দেওয়াল বেয়ে ওপরে উঠতে সক্ষম হয়েছিল। মাকড়সার সেই প্রচেষ্টা রবার্ট ব্রুশের মনে স্বপ্ন দেখিয়েছিল। মাকড়সার সেই মনোবল তার মনোবলকে বাড়িয়ে দিয়েছিল। সেই কারণে শেষ প্রচেষ্টায় রাজা জয়ী হয়েছিলেন।

এই যে একটি ছোট্ট প্রাণীর থেকে উৎসাহ তাকে অনেক সফল মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার শিক্ষা দিয়েছিল। সেই কারণে তাঁর কথা আজ আমরা জানছি, পড়ছি। বাস্তবজীবনেও আমাদের শেখার অনেক জায়গা আছে। প্রকৃতির বিভিন্ন বস্তু বা প্রাণি থেকেই আমরা শিক্ষা নিতে পারি। কিন্তু আমরা সেই শিক্ষাগুলো নিতে আগ্রহ করি না। নিতে চাই না। আমরা যদি একটি জিনিস থেকে শিক্ষা নেই অথবা একটি কিছু ভাল করে করি আমার বিশ্বাস করি, তাতেই আমরা ভাল কিছু উপহার দিতে পারব। কিন্তু আমরা অনেকে আছি লক্ষ্যটা নির্ধারণ করতে পারি না। ফলে লক্ষ্যহীনভাবে চলি। পাই না কোন তরী।

সত্যই আজ যারা বিভিন্ন সফল ব্যক্তিদের জীবনী পড়েন আমার বিশ্বাস তারা আমার সাথে একমত হবেন যে, তারা কিভাবে এসেছে। তাদের সাফল্যটা কিভাবে এলো। আসলে চেষ্টা আর মনোবল থাকলে কি না সম্ভব? একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে যেতে পারে সাফল্যের চূড়ান্ত চূড়ায়। একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য বদলে দিতে পারে জীবনের গল্প। একটি প্রচেষ্টা হতে পারে জীবনের সেরা গল্প। হয়ত আপনার সেই গল্প পড়েই অনুপ্রেরণা পাবে আগামীর প্রজন্ম।

বিশ সালটি সকলের জন্যই কষ্টের ছিল। করোনাকালে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিক্ষা, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ক্ষতি আমরা দেখেছি। শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে। আর করোনায় বাংলাদেশ হারিয়েছে রাষ্ট্রের অনেক গুণী, সাংস্কৃতিক কর্মী, কর্মকর্তা, সাংবাদিক, পুলিশসহ জনতার প্রায় আট হাজার প্রাণ। বিশ্বে মারা গেছে প্রায় আঠারো লক্ষ প্রাণ।

তাছাড়াও সড়ক দুর্ঘটনাসহ বিভিন্ন দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে অজানা আরও অনেক প্রাণ। যা আমাদের ব্যথিত করে। সেই সাথে কষ্টের মাঝে আমাদের স্বস্তির জায়গা তৈরি করেছে করোনাকালের মানবিকতা। আমরা দেখেছি করোনাকালে পুলিশসহ বিভিন্ন মানবিক মানুষগুলো কিভাবে সকলের পাশে দাড়িয়েছে। করোনাকালের সেই মানবিকতা সকলের মধ্যে জাগ্রত হোক, দূর হোক সকল জরা-ব্যাধি। একটি সুন্দর লক্ষ্যকে চিহ্নিত করে আমরা নতুন উদ্যোমে নুতনভাবে যাত্রা শুরু করি। করোনাসহ সকল অমানবিকতার বিদায় জানিয়ে মানবিক বিশ্ব কামনায় জানাই শুভেচ্ছা।

গোপাল অধিকারী
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট