পাহাড়ে আগাম আনারস চাষ বাড়ছে

0
3

রাঙামাটি প্রতিনিধি
লাভজনক হওয়ায় পাহাড়ে আগাম আনারসের চাষ বাড়ছে। মৌসুম শুরুর আগেই বাজারে আসতে শুরু করেছে ফলটি। সাধারণত জুন-জুলাই মাসে ব্যাপকভাবে উৎপাদন হতে শুরু হয় আনারস। চাষিরা জানাচ্ছেন, এখনো মৌসুম শুরু না হলেও পাহাড়ে কয়েক বছর ধরে আগাম ফলন আসা আনারস চাষ হচ্ছে। এতে মৌসুমে উৎপাদিত আনারসের থেকে আগাম আনারসে বাড়তি লাভ করতে পারেন তারা। কিন্তু মৌসুমে অনেক কৃষককেই আনারস চাষ করে লোকসানে পড়তে হয়।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) রাঙামাটি অঞ্চল সূত্রে জানা যায়, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান এই তিন পার্বত্য জেলায় ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৭ হাজার ৬৪৭ হেক্টর জমিতে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৩৮৮ টন, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৭ হাজার ৬৯৫ হেক্টর জমিতে ১ লাখ ৫৬ হাজার ৯২৪ টন, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৭ হাজার ৭৯৫ হেক্টর জমিতে ১ লাখ ৫৯ হাজার ২৭৭ টন, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৭ হাজার ৭৬৯ হেক্টর জমিতে ১ লাখ ৮১ হাজার ৯৯ টন আনারস উৎপাদন হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) রাঙামাটি কার্যালয়ের উপ-পরিচালক কৃষ্ণ প্রসাদ মল্লিক জানিয়েছেন, রাঙামাটির দশ উপজেলাতে কম-বেশি আনারস চাষ হলেও নানিয়ারচর ও রাঙামাটি সদর বেশি চাষ হয়ে থাকে। গত মৌসুমে রাঙামাটির দশ উপজেলায় ২১৩০ হেক্টর জমিতে ৫৫ হাজার ৮৫০ টন আনারস চাষ হয়েছে। এর মধ্যে নানিয়ারচরে ১০৭০ ও সদর উপজেলায় ৫৭০ হেক্টর। চলতি বছর চাষের জমি আরও বাড়বে। এখন পর্যন্ত কৃষি বিভাগের হিসাবে ৭৩০ হেক্টর জমিতে আগাম আনারস চাষ হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, আগাম আনারস চাষ হওয়ায় কৃষকরা লাভবান হচ্ছেন। পাইকারদের কাছে তারা এখন ৭-৮ টাকা দরে আনারস বিক্রি করছেন। পাইকাররা বাইরে নিয়ে সেই আনারস ২০-২২ টাকা দরে বিক্রি করছেন খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে।’
‘এখানকার আনারস এখন স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যাচ্ছে। এতে করে চাষিরা আনারস চাষে ঝুঁকছেন,’ বলে জানান তিনি।
কৃষ্ণ প্রসাদ মল্লিক আরও জানান, আগাম আনারস ফলানোর জন্য ইথ্রেল হরমোন ব্যবহার করা হয়। হরমোন প্রয়োগে প্রায় শতভাগ গাছে একসঙ্গে ফুল আসে। চারার বয়স নয় মাস হলে বা চারার ২২টি পাতা গজালে হরমোন প্রয়োগ করে আধা কেজি ওজনের ফল পাওয়া যায়। আবার চারার ১৩ মাস বয়সে ২৮টি পাতা গজালে হরমোন প্রয়োগ করে এক কেজি ওজনের ফল পাওয়া যায়।
তিনি বলেন, শীতকালে প্রতি একরে আড়াই হাজার গাছে আনারস ফলিয়ে এক লাখ টাকা আয় করা সম্ভব।
হরমোন প্রয়োগে স্বাস্থ্যের কোনো ঝুঁকি নেই জানিয়ে তিনি বলেন, হরমোনের কাজ হচ্ছে ফুল ফোটানো। আমরা পরীক্ষা করে দেখেছি, পাকা ফলে হরমোনের কোনো ক্ষতিকর প্রভাব থাকে না।
রাঙামাটির নানিয়ারচর উপজেলার হাতিমারা এলাকায় ২০ হাজার আনারসের চারা রোপণ করেছেন সজীব চাকমা। গত সপ্তাহে ৩ হাজার আনারস বিক্রি করেছেন ৯ টাকা দরে। তিনি বলেন, ‘যেহেতু মৌসুমে আমরা ভালো দাম পাই না, তাই এখন আগাম চাষ করি।’
পাইকারি ব্যবসায়ী আরমান আলী বলেন, আগাম আনারস হওয়ায় মৌসুমের চেয়ে এখন দাম বেশি। মৌসুমে প্রতিটি ৪-৫ টাকা কিনলেও এখন কিনতে হচ্ছে ৮-৯ টাকা দরে। আমরা এগুলো ১২-১৩ টাকা দরে বিক্রি করি।
এদিকে রাঙামাটির বনরূপা বাজার ঘুরে দেখা গেছে, স্থানীয়ভাবে খুচরা বাজারে প্রতি জোড়া মাঝারি আকারের আনারস বিক্রি হচ্ছে ৪০ টাকা দরে। বড় আকারের আনারস বিক্রি হচ্ছে ৫০ টাকা জোড়া।
চাষিদের কাছ থেকে কিনে অনলাইনে অর্ডারের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন স্থানে আনারসসহ বিভিন্ন মৌসুমী ফল বিক্রি করেন বলে জানালেন স্থানীয় উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী অনন্ত চাকমা। তিনি বলেন, ‘বাজারে এলাম আনারসের দর দেখতে। আগাম আনারস হওয়ায় আশা করছি ব্যবসায়ে ভালো সাড়া পাবো।’
পাহাড়ে উৎপাদিত আগাম আনারস স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে সমতলের বিভিন্ন জেলায় বাজারজাত হচ্ছে জানিয়ে মহালছড়ি উপজেলা কৃষি অফিসার মো. আব্দুল জব্বার জানান, ফলে স্থানীয় কৃষকরা আগাম আনারস চাষে ঝুঁকছেন। আগাম আনারস চাষ পাহাড়ে অর্থনীতির নতুন দিগন্ত উন্মোচিত করেছে বলেও মন্তব্য করেন এ কর্মকর্তা।