বাংলাদেশের কাছে উন্নয়ন শিখতে হবে

0
2

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে বাংলাদেশ যেভাবে আর্থ সামজিক প্রেক্ষাপটে পরিবর্তন এনেছে তা সারা বিশ্বের জন্য বিস্ময়ের এবং একইসঙ্গে শিক্ষণীয়। মার্কিন সংবাদ মাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের মতামত বিভাগে প্রথিতযশা সাংবাদিক নিকোলাস ক্রিস্টোফ -এর লেখায় এমন মন্তব্য করা হয়েছে।
বুধবার প্রকাশিত ওই মতামতে তিনি লিখেছেন, বিশ্বের সবচেয়ে সম্পদ এবং ক্ষমতাধর যুক্তরাষ্ট্র ১.৯ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের করোনা প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে, তার চূড়ান্ত অনুমোদনও হয়ে গেছে। মজার বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্রকে এখনো শিশু দারিদ্র্য দূরীকরণে কাজ করতে হচ্ছে। এই প্রণোদনা প্যাকেজের শর্তগুলো যদি যথাযথভাবে পালন করা যায় তবে শিশু দারিদ্র্যের হার অর্ধেকে নেমে আসবে বলে জানিয়েছে কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির গবেষকরা। সে দিক থেকে প্রেসিডেন্ট বাইডেনের এই বৈপ্লবিক পদক্ষেপকে রুজভেল্ট বর্ষীয়ান নাগরিকদের জন্য যে পদক্ষেপ নিয়েছিলেন তার সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে। সব সমাজেই দারিদ্র্যপীড়িত শিশুদের কল্যাণে বিনিয়োগের নজির রয়েছে। সেই বিনিয়োগ কী ফলাফল বয়ে এনেছিলো তা দেখার জন্য আমাদের অন্যদেশগুলোর পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে হবে। এখন আপনি যদি বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলোর দিকে তাকান তবে কী দেখতে পাবেন।
নিকোলাস ক্রিস্টোফ লিখেছেন, ৫০ বছর আগের এই মার্চ মাসেই গণহত্যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। স্বাধীনতা পাওয়ার পরও বাংলাদেশে ছিলো ক্ষুধা এবং দারিদ্র্য। হেনরি কিসিঞ্জার সে সময় বাংলাদেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি হিসেবেও উল্লেখ করেছিলেন। ১৯৭৪ সালের বাস্তবতায় বাংলাদেশের পরিচায়ক হয়ে উঠেছিল দুর্ভিক্ষপীড়িত এক শিশুর ছবি। সেই সময় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় দেশটির ব্যাপারে কোনো আশাই দেখেননি।
তিনি লিখেছেন, তারও কয়েক দশক পর ১৯৯১ সালে আমি বাংলাদেশে যাই। সেই সময় সাইক্লোনে এক লাখ মানুষের প্রাণহানি হয়। সেই সাইক্লোনের খবর সংগ্রহের কাজের অভিজ্ঞতা জানিয়ে দ্য টাইমসে সেই সময় আমি একটি নিবন্ধ লিখি। শিরোনাম দিই ‘দুর্ভাগা দেশ’। কিন্তু গত ৩০ বছরে বাংলাদেশের ক্রমিক উন্নয়ন আমার সেই ধারণাই পাল্টে দিয়েছে। এখন আর বাংলাদেশের ব্যাপারে আমার কোনো নেতিবাচক মনোভাব নেই।
বিশ্বব্যাপী করনা মহামারীর শুরুর মাত্র চার বছর আগেও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৭-৮ শতাংশ বলে জানিয়েছিল বিশ্ব ব্যাংক। যা চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকেও হার মানায়। বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশিত আয়ুষ্কাল ৭২ বছর। যা যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি অঙ্গরাজ্যকেও হার মানায়। তাই, বাংলাদেশ এক সময় হতাশার সাগরে হাবুডুবু খেতে থাকলেও এখন কীভাবে উন্নয়ন করতে হয়, তার শিক্ষাক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। সাফল্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের রহস্য কী? সহজ উত্তর: নারী শিক্ষা।
নিকোলাস ক্রিস্টোফ লিখেছেন, আশির দশকের শুরুর দিকেও বাংলাদেশের এক তৃতীয়াংশ জনগণ প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করতে পারতো। তাদের মধ্যে নারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল আরও নগন্য। আর অর্থনীতিতে নারীদের ভূমিকা ছিল না বললেই চলে।
কিন্তু, তার পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের সরকার এবং সুশীল সমাজের মধ্যস্থতায় শিক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়ার নীতি গ্রহণ করা হয়। এখন, বাংলাদেশের ৯৮ শতাংশ শিশুকে প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রমের আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে। তার চেয়েও অবাক করা তথ্য হচ্ছে, বাংলাদেশের মতো চরম লিঙ্গ বৈষম্য সম্পন্ন দেশে হাইস্কুল পর্যায়ে মেয়েদের সংখ্যা ছেলেদের চেয়ে বেশি।
বাংলাদেশ যেহেতু নারী শিক্ষাকে গুরুত্ব সহকারে নিয়েছে, তাই সেই শিক্ষিত নারীরা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের মূলভিত্তি হিসেবে কাজ করছে। দেশটির তৈরি পোশাকশিল্প নারীদের জন্য সবচেয়ে বড় কর্মক্ষেত্র তৈরি করে দিয়েছে। বাংলাদেশ এখন চীনের পর বিশ্বের সবেচেয়ে বড় তৈরি পোষাকের রফতানিকারক।
এছাড়াও শিক্ষিত নারীরা বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার সঙ্গেও জড়িত হচ্ছেন। তারা শিশুদের টিকাদান কার্যক্রম, যথাযথ পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা, গণশিক্ষা কার্যক্রম, জন্মনিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি এবং বাল্যবিবাহ বন্ধে কাজ করে যাচ্ছেন।
বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশকে দারিদ্র্য বিমোচনের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করেছে। ১৫ বছরে দেশটির দুই কোটি ৫০ লাখ মানুষ চরম দারিদ্র্য থেকে বের হয়ে এসেছে। ১৯৯১ সালের তুলনায় অপুষ্টিতে ভোগা শিশুর সংখ্যা অর্ধেকে নেমে এসেছে। বর্তমানে, বাংলাদেশে অপুষ্টিতে ভোগা শিশুর সংখ্যা ভারতের তুলনায়ও কম। এমনকি, বাংলাদেশের বর্ধিত জনসংখ্যাকে যারা একটি সমস্যা হিসেবে দেখছিলেন, তাদের জন্য সুখবর হলো এখন বাংলাদেশি নারীর জনপ্রতি সন্তানসংখ্যা দুই।
তাই, শিশু দারিদ্র্য বিমোচনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বাইডেন প্রশাসনের জন্য একটি শিক্ষামূলক অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।