বাবা-মায়ের হাতেও আজকাল সন্তান নিরাপদ নয়

0
16

আব্দুল হাই রঞ্জু :

দুনিয়ার সবচেয়ে মধুর ডাক হচ্ছে ‘মা’। ছোট্ট একটি শব্দ, অথচ কি তার বিশালতা! স্নেহ, মায়া, মমতা, আদর আর আবেগে ভরা। একবার মা বলে ডাকলে প্রাণ জুড়ে যায়। সেই মাকে হারিয়েছি তিন বছর আগে। এ শূন্যতার যে কি কষ্ট, তা শুধু মা হারানোরাই উপলব্ধি করতে পারেন। তবুও মনের অজান্তেই দিন-রাতে মাকে ডাকি। মাকে ডাকলেই যেন কোন এক প্রশান্তির ছোঁয়ায় উজ্জীবিত হই। যে মা ১০ মাস ১০ দিন গর্ভে রেখে কত কষ্ট করে দুনিয়ার মুখ দেখার সুযোগ করে দিয়েছে, সে মায়ের কি কোন তুলনা আছে? প্রচন্ড প্রসব বেদনায় কাতরাতে কাতরাতে সন্তান জন্ম দিয়ে মায়ের পরম তৃপ্তির কথা কত মায়ের মুখে শুনে বড় হয়েছি। শুধু জন্মদাতাই না, একজন মা সন্তানকে কত কষ্ট করে লালন পালন করেন, যা শুধু মায়ের জন্যই সম্ভব। হয়ত মায়ের মতো অনেক স্বজনই আছেন, কিন্তু মায়ের অভাব দুনিয়ায় কেউই পূরণ করতে পারে না। মা অভুক্ত থেকে সন্তানকে খাওয়ায়, সন্তানকে বড় করে। মা শিক্ষিত না হলেও সন্তানকে শিক্ষিত করতে মায়ের প্রচেষ্টার শেষ থাকে না। সন্তানের অসুখে কত বিনিদ্র রজনী কাটে মায়ের। একমাত্র ভরসার শেষ স্থল হলো মা। যে কারণে বলা হয়ে থাকে, ‘দুনিয়ার সন্তানের জন্য নিরাপদ আশ্রয়স্থল হলো মায়ের কোল।’ অথচ সন্তান বড় হয়ে সে মাকে যখন অবহেলা করে, খেতে দেয় না, সন্তানের কাছে মায়ের আশ্রয় হয় না, এর থেকে একজন মায়ের দুর্ভাগ্য আর কি হতে পারে? প্রতিদিনই পত্রিকার পাতা খুললে কিম্বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জানতে পারছি, কত মায়ের করুণ কাহিনী। আবার কত অভিমানী মা সন্তানকে সাথে নিয়ে আত্মহত্যার মতো অনাকাংখিত ঘটনাও ঘটাচ্ছে। সম্প্রতি ষাটোর্দ্ধ সালেমা আমজাদের এক করুণ কাহিনী ফেসবুকে পড়েছি। তারপর থেকে ভাবছি, এ বিষয়টি নিয়ে কিছু একটা লিখবো।
তাঁর জন্ম যুক্তরাজ্যের লন্ডনে। শৈশব, কৈশোর থেকে শুরু করে লেখাপড়া, বেড়ে ওঠা সবটাই ওই শহরে। ওখানেই বিয়ে, তারপর চার সন্তানের মা হওয়ার সুখ শান্তি সবই ওই লন্ডনে! জীবনের দীর্ঘসময় স্বামী আর চার ছেলে-মেয়েকে নিয়ে কাটিয়েছেন সুখ সাচ্ছন্দের জীবন। আর দশজন মায়ের মত আদর, মমতা, ভালবাসায় সন্তানদের বড় করেছেন। সব ছেলে মেয়েই উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হয়েছেন। মায়ের কত স্বপ্ন ছিল, সন্তান বড় হলে তার জীবন আরো ভাল কাটবে। নাতি-নাতনিদের নিয়ে কাটবে মায়ের অবসর জীবন। কিন্তু তা আর ওই বৃদ্ধার ভাগ্যে জোটেনি! ছেলে মেয়েরা বড় হওয়ার পর স্ত্রী, সন্তানদের নিয়ে যার যার মতো সবাই গুঁছিয়ে ফেলেন সবার জীবন সংসার। আর বৃদ্ধা মা সালেমা আমজাদের আর জায়গা হয়নি সন্তানদের কাছে। এক পর্যায়ে ক্ষোভে, দুঃখে, অভিমানে লন্ডনের দীর্ঘ জীবনের ইতি টেনে কপর্দকশূন্য হাতে চলে আসেন বাংলাদেশে বাবার জন্মভিটা খুলনাতে। যেখানে এসেও খুঁজে পাননি কোন স্বজনের! অবশেষে ফরিদপুরের এক সাংবাদিকের সহায়তায় ঠাঁই হয় রাজধানীর কল্যাণপুরের চাইল্ড অ্যান্ড ওল্ড কেয়ার সেন্টারে। আড়াই বছর ধরে সেখানেই কাটছে বৃদ্ধা মায়ের জীবন। বাবুল হোসাইন নামে এক প্রতিবেদক চাইল্ড অ্যান্ড ওল্ড কেয়ার সেন্টারে গিয়ে দেখেন, এরকম অর্ধশতাধিক বৃদ্ধ মা-বাবা সেখানেই দিন কাটাচ্ছেন। তাঁদের অনেকেই বিভিন্ন সময় রাষ্ট্র ও সমাজের নানান গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে দায়িত্ব পালন করেছেন। সেখানে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষককেও দেখেছেন। যারা সারাজীবন মানুষ সৃষ্টির কারিগর হিসেবে কাজ করেও নিজের সন্তানদের অবহেলার শিকার হয়ে আজ বৃদ্ধাশ্রমে দিন কাটাচ্ছেন। তিনি দেখেছেন, সাবেক পুলিশ কর্মকর্তার এক স্ত্রী বিছানায় শুয়ে কাঁদছেন, আর চোখের পানি মুছছেন। অথচ তারা নিজেদের জীবনের সবকিছু উজাড় করে একসময় সন্তানদের সুখ শান্তির জন্য লেখাপড়া শিখিয়ে দেশে-বিদেশে প্রতিষ্ঠিত করেও ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, আজ তারা পরিবারের মায়া মমতা, ছেড়ে বাসিন্দা হয়েছেন বৃদ্ধাশ্রমে। এই বৃদ্ধাশ্রমের চেয়ারম্যান হচ্ছেন, মিল্টন সমাদ্দর। নিজের উদ্যোগেই গড়ে তুলেছেন এই প্রতিষ্ঠানটি। প্রতিবেদক বাবুল হোসাইন ওনার সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটি নিয়ে কথা বলতেই সেখানেই হাজির হন লন্ডন প্রবাসী বৃদ্ধা মা সালেমা আমজাদ। মিল্টন সমাদ্দের কাছে সালেমার ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি ওই প্রতিবেদককে বলেন, ওনার মতো আমার আরো ৫৬ জন মা-বাবা এখানে রয়েছেন। অথচ মিল্টন সমাদ্দরও তো কোন না কোন বাবা-মায়ের সন্তান। শুধু এক মা-বাবাই না, তিনি আজ লালন পালন করছেন ৫৬-৫৭ জন অসহায় আশ্রয়হীন মা-বাবাকে। স্যালুট আপনাকে। আপনি বেঁচে থাকবেন মানুষের ভালবাসা আর শ্রদ্ধায়। অথচ অভাগাদের মা-বাবারা আজ বৃদ্ধাশ্রমে কত কষ্ট নিয়ে বেঁচে আছেন? সালেমা আমজাদ জানান, তাঁর জন্ম লন্ডনে। সেখানেই বেড়ে ওঠা। তারপর দীর্ঘ জীবন সংসার। তিন ছেলে এক মেয়েকে নিয়ে কত সুখের স্মৃতি! অথচ আজ সবকিছু শেষ। এ নিয়ে তিনি আর তেমন কিছুই বলতে চাননি। শুধু বলেছেন, সন্তানদের মাঝে আমার জায়গা হয়নি। আমি চলে এসেছি আমার আর এক সন্তানের কাছে। এখানেই থাকবো। এখানেই মরবো, এটাই আমার শেষ ঠিকানা। এই ছেলের বুকে মাথা রেখেই চলে যাবো। কি এক নির্মম কাহিনী! এমনি হাজারো ঘটনা আমাদের দেশে ঘটছে। কিন্তু কেন এই অবক্ষয়? কেন বৃদ্ধ বয়সে মা-বাবাদের স্থান সন্তানদের কাছে হয় না? এ জন্য সন্তানদের শুধু উচ্চ শিক্ষিত করলেই হবে না, ওদের মানুষ করতে হবে। শিক্ষিত হলেই মানুষ হওয়া যায় না। মানুষ হওয়ার শিক্ষা আলাদা। মূলত আমাদের ভোগবাদী এই সমাজ ব্যবস্থায় স্বার্থের অন্ধত্ব মানুষকে অমানুষ করে তোলে। এ জন্য মানবিক মুল্যবোধকে জাগ্রত করতে হবে। সন্তানদের ছোটবেলা থেকেই মানবিক হওয়ার শিক্ষা দিতে হবে। আবার অনেক সময়ই বাবা-মায়ের হাতে সন্তান খুনের মতো ঘটনাও দেদার ঘটছে। মুলত সামাজিক অবক্ষয়, মানবিক মুল্যবোধের অভাব, মাত্রাতিরিক্ত লোভ লালসা, ঘুষ, দুর্নীতি, অনৈতিক জীবন, দাম্পত্ত কলোহ, সংসারে অশান্তির দরুণ আদরের শিশু সন্তানকেও বাবা-মায়ের হাতে খুন হতে হচ্ছে।
২ এপ্রিল জাতীয় এক দৈনিকে ‘দুই শিশুকে হত্যা করে মায়ের আত্মহত্যা’ শিরোনামে প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, পাঁচ বছরের ছোট্ট এক শিশুকে খাবারের প্রলোভন দেখিয়ে শ্লীলতাহানির চেষ্টা করে সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার লাঙ্গলঝাড়া গ্রামের লাল্টু গাজীর ছেলে হৃদয় হোসেন। বিষয়টি লঙ্গলঝাড়া গ্রামের ট্রাক্টর চালক শিমুল বিল্লাহ ও তার স্ত্রী মাহাফুজা খাতুন স্থানীয় ইউপি সদস্য সাজিদুল ইসলাম ও ইউপি চেয়ারম্যান মাস্টার নুরুল ইসলামকে জানিয়ে ন্যায় বিচার চান। কিন্তু সামনে ইউপি নির্বাচন, এই দোহাই দিয়ে বিষয়টি এড়িয়ে যান জনপ্রতিনিধিরা। এতে ক্ষুব্ধ ও অপমানিতবোধ করে গৃহবধু মাহাফুজা খাতুন ৯ বছরের ছেলে মাহাফুজ ও ৫ বছরের মেয়ে মোহনাকে গত ৩১ মার্চ বুধবার দিবাগত রাতের কোন এক সময় হত্যা করে মা গলায় শাড়ি পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। মুলত মেয়েকে ধর্ষণ চেষ্টার বিচার না পেয়েই ক্ষুব্ধ হয়ে সন্তানদের খুন করে নিজেই আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন। মায়ের এ ধরণের প্রতিবাদ কখনই আমাদের কাম্য নয়। কারণ জনপ্রতিনিধিরা বিচার না করলেও দেশের প্রচলিত আইনে বিচার চাওয়ার যথেষ্ট সুযোগ ছিল। সে পথে না হেঁটে উনি সম্ভাবনাময় সন্তানদের খুন করেছেন এবং নিজেও আত্মহত্যা করেছেন, এধরণের ঘটনা অনাকাংখিত। সকলকে ভাবতে হবে, বিচারের জায়গা শুধু জনপ্রতিনিধিরাই নয়, থানা এবং আদালত রয়েছে। যদিও দেশের অনেক নাগরিক থানা কিম্বা আদালত পর্যন্ত যেতে চান না। কারণ ভিকটিমকেই প্রমাণ করতে হয় সে ধর্ষিত অথবা ধর্ষণের চেষ্টার শিকার। কিন্তু বিচার পেতে তো আদালতে যাওয়া ছাড়া গতন্তর নেই! এ ঘটনা থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে, ভবিষ্যতে আর কোন মা যেন এ ভাবে সন্তানদের খুন করে নিজে আত্মহত্যা না করেন। আর মায়ের হাতে সন্তান খুনের ঘটনাও যেন দিন দিন বেড়েই চলছে। গত ৫ এপ্রিল বাগেরহাটের শরণখোলার মজিদ মোল্লা পারিবারিক কলহের জেরে বড় ভাই রশিদ মোল্লাকে ফাঁসাতে নিজের চার মাসের সন্তানকে বাড়ীর পাশের পুকুরে ফেলে হত্যা করেছে। মর্মান্তিক এ ঘটনায় পুলিশ অভিযুক্ত বাবা মজিদ মোল্লাকে গ্রেফতার করেছে। এ ঘটনায় শিশুটির মা মারুফা বেগম বাদী হয়ে স্বামীর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছেন। প্রাথমিক তদন্তে অভিযুক্ত মজিদ মোল্লা সন্তানকে পুকুরে ফেলে হত্যার কথা স্বীকারও করেছেন। কি পরিমাণ নিষ্ঠুরতা থাকলে একটি নিস্পাপ শিশুকে বাবা পুকুরে ফেলে হত্যা করতে পারে? সমাজটা দিন দিন যেন নিষ্ঠুরতার শেষ সীমানায় পৌঁছে গেছে। তা না হলে সন্তানদের নিরাপদ কোল মা-বাবার কাছেও কেন সন্তানদের বেঁচে থাকার ন্যুনতম গ্যারান্টিটুকু আজ নেই? গত ২ এপ্রিলের ঘটনা। ঢাকার আন্তর্জাতিক হযরত শাহজালাল বিমান বন্দরে ৮ মাসের এক কন্যা শিশুকে ফেলে গেছেন সৌদিফেরৎ এক কর্মজীবী মা। শিশুটির কান্নাকাটি শুনে বিমানবন্দরের আর্মড ফোর্স ব্যাটালিয়ন পুলিশের কয়েকজন নারী সদস্য শিশুটির জন্য ফিডার সংগ্রহ করে দুধপান করিয়ে কান্না থামান। শিশুটিকে রাজধানীর আজিমপুর মাতৃসদন ও শিশু স্বাস্থ্য প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে হস্তান্তর করা হয়েছে। ওই নারীর সঙ্গে বিমানে আসা যাত্রী আসমা জানান, ওই মহিলা সৌদি আরবে কাজে গিয়ে বিয়ে করেন। সেখানেই তার ওই সন্তানের জন্ম হয়। ফেরার আগে তাদের বিয়ে বিচ্ছেদও হয়। যে কারণে গর্ভজাত সন্তানকে বিমান বন্দরে ফেলে মা চম্পট দেয়। কি নির্মম নিষ্ঠুরতা! এখন ওই শিশুটি বাবা-মা পরিচয়হীন হয়েই হয়ত বড় হবে। এরপর কি হবে তাতো আর জানার সুযোগ দেশের মানুষের হবে না। এভাবে কম-বেশি প্রতিদিনই নিষ্ঠুর ঘটনা ঘটেই চলছে।
সমাজ বিশ্লেষকদের মতে, পারিবারিক মুল্যবোধের অবক্ষয়, বেকারত্ব, অনৈতিকতা, উচ্চাকাংখা, সংস্কৃতির নেতিবাচক প্রভাব, অনলাইন প্রযুক্তির কু-প্রভাব, অনৈতিক জীবনযাপন, পারিবারিক বা সামাজিক বিরোধ, স্বার্থপরতা, লোভলালসার কারণে শিশু হত্যা কিম্বা শিশু নির্যাতনের মতো ঘটনা ঘটছে। মুলত মানুষের মানবিক গুণাবলী ক্রমশ লোপ পাচ্ছে। নৈতিক মুল্যবোধের অবক্ষয় ও অসহিষ্ণু মনোভাবের কারণে নিষ্পাপ শিশুদের প্রতি নির্মম আচরণ করা হচ্ছে। মোদ্দা কথা, সর্বগ্রাসী সামাজিক অবক্ষয় থেকে দেশকে বাঁচাতে হলে পরিবার ও সমাজের প্রতিটি মানুষকে সচেতন হতে হবে। পাশাপাশি শিশু নির্র্যাতন, খুনের ঘটনায় উপযুক্ত বিচার দ্রুততম সময়ের মধ্যে নিশ্চিত করতে হবে। কারণ একমাত্র উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করেই নিরাপরাধ শিশুদের নিরাপদে বেড়ে ওঠার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে সন্তানের জন্য নিরাপদ মায়ের কোলও ভবিষ্যতে আরো অনিরাপদ হয়ে উঠবে। অথচ মানুষই নয়, জীবমাত্রই তাদের জন্মদাতা মা সন্তানকে আগলে রেখে বড় করে। আর সৃষ্টির সেরা জীব মানুষের কোলে সন্তানদের নিরাপত্তা দিনে দিনে সংকোচিত হয়ে আসছে। এ লক্ষণ একটি সভ্য রাষ্ট্র বিনির্মাণের পথে বড় অন্তরায়, যা বলার অপেক্ষা রাখে না। আমরা মনে করি, সচেতনতার পাশাপাশি আইনের শাসনের প্রয়োজনকে শতভাগ নিশ্চিত করতে হবে, তা না হলে বাবা-মায়ের হাতে সন্তান হত্যার নির্মমতা রোধ করা অনেকাংশেই কঠিন হবে।
লেখক : কলামিস্ট