মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী, পরীক্ষা নিয়েই শিক্ষার্থীদের হাতে রেজাল্ট দিন

0
20

আতাতুর্ক কামাল পাশা

বহুদিন আগের কথা। আমার এক বন্ধু ঢাকার বাইরে থেকে এসেছিল একটি চাকরির ইন্টারভিউ দিতে। তাকে নিয়ে গিয়েছিলাম মতিঝিলের হাইস্পীড বিল্ডিংয়ে। অনেক ছেলে মেয়ে ইন্টারভিউ দিতে এসেছিল।
দুপুর দু’টোর দিকে তার ইন্টারভিউ শেষ হয়ে যায়। সে বের হয়ে এলে তাকে নিয়ে রাস্তায় এলাম। এক চায়ের দোকানে বসলাম। চা পান করা শুরু করলাম। জিজ্ঞেস করলাম, কেমন হলো ইন্টারভিউ? সে চুপচাপ থাকল। চা পান করে আমরা বেরিয়ে এলাম রেস্তরাঁটি থেকে। একটি বাসে উঠে পড়লাম। এলাম বাসায়। সে চুপচাপই থাকছিল। দুপুরের খাবার পর সে বলল, রাতের বাসেই বাড়িতে চলে যাবে। তখনো ইন্টারভিউয়ের ফলাফল সম্পর্কে কিছু বলেনি।
বন্ধুটিকে যখন রংপুরের বিআরটিসির নাইট কোচে উঠিয়ে দিলাম কমলাপুর থেকে, সে সিট ঠিক করে, কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ নিয়ে আবার নেমে এলো। আমার গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে বলল, জীবনে আর চাকরির জন্য কোনো ইন্টারভিউ দেবো না। বাবার যা জমি-জমা আছে, সেগুলোই চাষাবাদ করে চলব। আমি কারণও জানতে চাইলাম না। থ মেরে দাঁড়িয়ে থাকলাম।
সে বিদ্যালয়ে বরাবরই ফার্স্ট বয় ছিল। এসএসসিতে ফার্স্ট ডিভিশান, তা-ও কলাবিভাগ থেকে। এইচএসসিতেও প্রথম বিভাগ। বিএ-তেও বেশ ভালো ফল। হঠাৎ চাকরির প্রতি এমন অনীহা কেন দেখে আমিই হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলাম সেদিন। খুব ভালো মেধাবান ছিল বন্ধুটি। কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে সে বলল, আমাকে প্রশ্নকর্তা জিজ্ঞেস করেছিলেন, যিধঃ রং ই.খ. ? আমি তো আর্টস্-এর ছাত্র। বললাম, স্যার, আমি জেনারেল পোস্টের জন্য দরখাস্ত করেছি। বি.এল. অ্যাব্রিভিয়েশানের (ধননৎবারধঃরড়হ) উত্তরটা আমার জানা নেই। তিনি আমার দিকে চরম অবহেলার চোখে কিছুক্ষণ তাকালেন। তারপর বললেন, ও-ও আপনি বাহাত্তুরের কেন্ডিডেট, তাই না? লজ্জায় আমার মাথা নিচু হয়ে এসেছিল। সবাই জানে, স্বাধীনতাযুদ্ধের পর বাহাত্তর সালের পরীক্ষায় চেয়ার টেবিলশুদ্ধ সবাই পাশ করে গিয়েছিল। কিন্তু তুই তো জানিস আমার ক্যারিয়ার। একটি পরীক্ষার জন্য আমার সারাজীবন এমন অবমূল্যায়ীত হবে, ভাবতে পারিনি।
আজ বহুদিন পরও সে বন্ধুটির কথা মনে পড়ে। সে বছরের পরীক্ষার ফলাফল সবাই জানেন। সে বছর কেমন পরীক্ষা হয়েছিল, তা-ও সবার জানা আছে।
যাঁরা মেধাবান ছাত্র সে বছর পরীক্ষা দিয়েছিল, তাঁদের সে বছরের পরীক্ষা জীবনের একটি জন্মদাগ হিসেবে থেকে গিয়েছে। তাঁরা কোনোদিন এ জন্মদাগটি তাঁদের শরীর থেকে মুছে ফেলতে পারবে না।
এই বাহাত্তর সালের পরীক্ষা নিয়ে পরবর্তী অনেক বছর হাসাহাসি হয়েছিল, এখনো রসাত্মক কথা হয়।
নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থার ওপর টেলিভিশনে একটি বিজ্ঞাপনচিত্র দেখা যায়, বিজ্ঞাপনটির শেষদিকে একটি শিক্ষণীয় বার্তা দেয়া হয়, “একটি দুর্ঘটনা, সারাজীবনের কান্না।” আজ যারা অটোপ্রমোশন পাচ্ছে, জীবনের প্রতি পদে পদে তাদের এমনধরণের শ্লেষাত্মক কথা শুনতে হতে পারে, এটি স্বাভাবিক। হয়ত তারা প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় বা অন্য কোন প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে যেতে পারে।
এ কারণে মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীর প্রতি অনুরোধ, যেভাবেই হোক শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা নিয়ে তাদের হাতে রেজাল্ট দিন।

লেখক : কলামিস্ট ও সাহিত্যিক