মিডিয়ার সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক চাই: আইজিপি

0
3

নিজস্ব প্রতিবেদক

বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. বেনজীর আহমেদ বলেছেন, আমরা গণমাধ্যমের সঙ্গে দূরত্ব নয় প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক চাই। অন্যায় বা ভুল করলে পুলিশের যে কারও বিরুদ্ধে লিখবেন। কিন্তু কখনো মিথ্যা বানোয়াট তথ্য লিখবেন না। যা লিখবেন সেটা যাতে সত্য হয়।

বৃহস্পতিবার দুপুরে বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ক্র্যাব) নবনির্বাচিত কার্যনির্বাহী কমিটির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, সাংবাদিকতায় এখন অনেক চৌকস মেধাবীরা আসছেন। তাদের কাছে আমাদের প্রত্যাশা অনেক বেশি। পুলিশ বিভাগেও স্বচ্ছতা জবাবদিহিতা ফিরিয়ে আনা হয়েছে। আমাদের ভালো কাজ মিডিয়ার মাধ্যমে জনগণ যেন জানতে পারে সেদিকে নজর দিতে হবে।

পুলিশ সদর দপ্তরের শাপলা কনফারেন্স সেন্টারে সৌজন্য সাক্ষাৎ অনুষ্ঠানে ক্র্যাব সভাপতি মিজান মালিক ও সাধারণ সম্পাদক আলাউদ্দিন আরিফের নেতৃত্বে কমিটির অন্যান্য সদস্যরা এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

সাগর-রুনি হত্যা মামলার অগ্রগতির বিষয়ে জানতে চাইলে আইজিপির পক্ষে অতিরিক্ত আইজিপি ড. মইনুর রহমান চৌধুরী বলেন, আমরা সাগর-রুনি হত্যা মামলাসহ পুরোনো সব মামলা নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিয়েছি। আশা করছি শিগগিরই সাগর-রুনি হত্যা মামলার অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল করা হবে।

অনুষ্ঠানে আইজিপি ড. বেনজীর আহমেদ বলেন, গণমাধ্যমের সঙ্গে দূরত্ব নয় বরং প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে। গণমাধ্যমের যেমন আমাদের দরকার তেমনি আমাদেরও গণমাধ্যমকে দরকার। মানুষের জানার অধিকার আছে। সাংবাদিকদের সঙ্গে পুলিশের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক রয়েছে। মেইন স্ট্রিম মিডিয়ায় দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহিতা রয়েছে। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনো জবাবদিহিতা বা দায়বদ্ধতা নেই। সেখানে বলা হয়েছিল মেইন স্ট্রিম মিডিয়া যেটা পাশ কাটিয়ে যায় সেটা সোশ্যাল মিডিয়া তুলে ধরবে। কিন্তু সেটা আসলে হচ্ছে না। সোশ্যাল মিডিয়া থেকে গুজব ছড়ানো হচ্ছে, তারা যা খুশি তা প্রচার করতে পারছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় গুজব ছড়ানো সমস্যা একটা বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ। এটা মোকাবিলা করতে যৌথভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।

আইজিপি বলেন, আমি যখন ডিএমপি কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব নেই তখন দেখলাম প্রতিদিন মার্ডার, ছিনতাই, ডাকাতিসহ নানা অকারেন্স। গুলশানে দেখলাম এক দিনে ২৭টা গাড়ি চুরির ঘটনা। তখন আমি আমার একজন উপ-কমিশনারের কাছে বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি বলেন, ডিএমপিতে এটা স্বাভাবিক ঘটনা। আমি বিশ্বের বিভিন্ন দেশঘুরে ও জাতিসংঘ মিশনে লব্ধ অভিজ্ঞতার আলোকে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিলাম। এতে ছিনতাই, খুন ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড অনেকটা নিয়ন্ত্রণে আসে।

আইজিপি বলেন, আপনারাই পত্রিকায় লিখতেন এক সময় ঢাকায় ১৬৫ টি ছিনতাই স্পট ছিল। খেজুরবাগান এলাকায় সন্ধ্যার পর যাওয়া মানেই ছিনতাইয়ের কবলে পড়া। কিন্তু এখন মধ্যরাতেও একজন হেঁটে যেতে পারেন। সেই সমস্যা এখন নেই। বিমান বন্দর থেকে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত রেল লাইনের দুই পাশে ছিল মাদকের হাট। এখন রাজধানীসহ সারা দেশে মাদক ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড অনেকটাই কমে এসেছে। আগে প্রতিদিন গুলি ছিনতাইয়ের খবর পাওয়া যেত। গুলশান বারিধারা এলাকায় এখন চুরি ছিনতাই নেই বললেই চলে। কারণ এখন পুরো এলাকাটি সিসি ক্যামেরার আওতায়। গুলশান, বারিধারা, বনানী এলাকায় সাড়ে ১১শ’ সিসি ক্যামেরা লাগানো হয়েছে স্থানীয় এলওসি’র সহায়তায়। তিনি বলেন, লন্ডনে ১৩ মিলিয়ন সিসি ক্যামেরা রয়েছে। যার মাত্র ১ মিলিয়ন সিসি ক্যামেরা লন্ডন মেট্রোপলিটন পুলিশের। বাকি সব ব্যক্তি বিশেষের। লন্ডনের পুলিশ তাদের ক্যামেরাগুলো একই সার্ভারে যুক্ত করেছে। ফলে একজন লোক লন্ডন শহরে ১০ মিটার গেলেই কোন না কোন ক্যামেরায় ধরা পড়ে।

পুলিশে আমূল পরিবর্তন এসেছে উল্লেখ করে আইজিপি বলেন, পুলিশ সদস্যরা এক সময় টেলিভিশন ক্যামেরা দেখলে পালাতো। কিন্তু এখন একজন রাস্তায় দায়িত্ব পালন করা কনস্টেবলও সাংবাদিকদের সঙ্গে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কথা বলেন। আমি মনে করি এটাই পরিবর্তন। মিডিয়ার সঙ্গে দূরত্ব নয়, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সংযোগ স্থাপন করতে হবে।

তিনি বলেন, করোনায় ফ্রন্ট লাইনের যোদ্ধা হিসেবে পুলিশ সাংবাদিক একত্রে কাজ করেছে। রাজারবাগে ২৫০ শয্যা পুলিশ হাসপাতালকে ১৫ শ শয্যায় উন্নীত করা হয়েছে। শুধু পুলিশ সদস্য নয়, সাধারণ মানুষও সেখানে চিকিৎসা নিচ্ছে। করোনায় ৮৫ পুলিশ সদস্য মারা গেছেন। তবে বর্তমানে পুলিশ বাহিনীতে করোনা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

দেশের উন্নয়নে পুলিশ ক্র্যাবকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, নতুন প্রজন্মের জন্য একটি ভালো দেশ রেখে যেতে চাই।

তিনি বলেন, মাদক আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। আমাদের মিজরাম ও মিয়ানমারে সীমান্তে কিছু জটিল ও দুর্গম জায়গা আছে। সেখানে শেষ বিজিবি বিওপি যেতেও ৮ দিন সময় লাগে আবার ফিরতে লাগে ৮ দিন। আমরা সেটা নিয়ন্ত্রণেও কাজ করছি। সীমান্ত সড়ক তৈরি হচ্ছে। আগামী দুই বছরে ৮০ কিলোমিটার সীমান্ত সড়ক তৈরি হবে। আগামী ১০ বছরের মধ্যে আমরা যদি ৪০০ কিলোমিটার সীমান্ত সড়ক নির্মাণ করতে পারি তাহলে মাদক নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখা যাবে।

বাংলাদেশের আর্থ সামাজিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমার একজন বিদেশি বন্ধু এসেছিলেন। তিনি বলেন ৮ বছর আগে তোমাদের দেশে খালি পা ও খালি গায়ে লোক দেখেছি। কিন্তু এখন খালি পায়ে বা খালি গায়ে কাউকে দেখিনি। সবার গায়ে কাপড় ও পায়ে জুতা এসেছে। দেশের এই উন্নয়নের জন্য সরকারকে অনেক রিসোর্স বরাদ্দ দিতে হয়েছে। কুড়িগ্রামসহ উত্তরাঞ্চলে এখন আর মঙ্গা বলে কোন শব্দ নেই। এখন দেশে কেউ না খেয়ে মরে না। বিগত বাজেটেও ৪৫ হাজার কোটি টাকা রাখা হয়েছে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে। যাতে না খেয়ে কেউ না মরে। মানব উন্নয়নে সরকারের বড় বাজেট চলে যায়।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন অতিরিক্ত আইজিপি ড. মো. মইনুর রহমান চৌধুরী, পুলিশের পক্ষে স্বাগত বক্তব্য রাখেন এআইজি (মিডিয়া) সোহেল রানা। শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন ক্র্যাবের সাধারণ সম্পাদক আলাউদ্দিন আরিফ। এছাড়া ক্র্যাবের নানা পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে বক্তব্য রাখেন ক্র্যাব সভাপতি মিজান মালিক। অনুষ্ঠানে পুলিশ কর্মকর্তাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন, অতিরিক্ত আইজিপি এস এম রুহুল আমিন, ডিআইজি খুরশিদ আলম, ডিআইজি এমওয়াই বেলালুর রহমান, মাহবুবুর রহমান ভূঁইয়া, তৌফিক মাহবুব চৌধুরী, আবু হাসান মোহাম্মদ তারেক, অতিরিক্ত ডিআইজি মাসুদুর রহমান, উপ-প্রধান তথ্য কর্মকর্তা একেএম কামরুল আহছান।