রাজস্ব উন্নয়নে রাজস্ব-কমিশন গঠন অতীব জরুরি

0
36

ড. এস এম জাহাঙ্গীর আলম :

বাংলাদেশের জিডিপি ছিল ২৬ দশমিক ৬০ শতাংশ। আমরা যদি ২০২০ সাল থেকে পূর্ববর্তী পাঁচ বছরের দিকে নজর দেই, তাহলে দেখা যায় যে, প্রতিবেশী অন্যান্য দেশের চেয়ে বাংলাদেশে রাজস্ব আদায়ের পরিবেশ অত্যন্ত দুর্বল। নেপাল একটি ছোট দেশ। সে দেশে রাজস্ব জিডিপিতে বাংলাদেশের চেয়ে অনেক এগিয়ে আছে। যেমন, ২০১৯ সালে নেপালে কর জিডিপি’র হার ছিল ২৬ দশমিক ০২ শতাংশ, একই সময়ে বাংলাদেশে ছিল ৯ দশমিক ৯ শতাংশ। ভারতে ছিল ১৯ দশমিক ০৬ শতাংশ, পাকিস্তানে ১৪ দশমিক ০৭ শতাংশ। গত ২০২০ সালে উন্নয়নশীল দেশগুলোর গড় রাজস্ব প্রবৃদ্ধির হার ছিল ২৫ দশমিক ০৬ শতাংশ, ২০১৯ সালে ছিল ২৫ দশমিক ০৩ শতাংশ, ২০১৮ সালে ছিল ২৬ দশমিক ০১ শতাংশ। যাই হউক, বাংলাদেশের রাজস্ব খাতে প্রবৃদ্ধি বাড়ছে ঠিকই তবে আশানুরূপ গতিশীলতা বাড়ছে না। অর্থমন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে রাজস্ব খাতে প্রবৃদ্ধি ১৪ শতাংশে পৌছালেও করোনার কারণে ২০১৯-২০ অর্থবছরে এক ধাক্কায় কমে আসে ৪ দশমিক ০২ শতাংশে। বর্তমান সরকার রূপকল্প-২০৪১ ঘোষণা করেছেন। উন্নত দেশের পর্যায়ে যেতে রূপকল্প-২০৪১ এর রোডম্যাপ বা পথচিত্র তৈরি করা হয়েছে তা আগামী ২০ বছরের জন্য অথনৈতিক ব্যবস্থাপনায় ব্যাপক পরিবর্তন আনার কথাও বলা হয়েছে। ঐ সময়ে বার্ষিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি নির্ধারণ করা হয়েছে ৯ দশমিক ৯ শতাংশ, আর কর জিডিপি’র লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১৭ শতাংশে। এমতাবস্থায় রাজস্ব আহরণের গতি অবশ্যই বাড়াতে হবে। অপরদিকে টেকসই লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে বিশ্বব্যাপী আগামী ২০৩০ সাল পর্যন্ত ২ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন অতিরিক্ত বিনিয়োগ দরকার। আর বাংলাদেশের দরকার ৯২৮ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ প্রতিবছর অতিরিক্ত ৬০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ লাগবে। ব্যাপক এই বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে রাজস্ব খাতে ব্যাপক সংস্কার করে রাজস্ব আয় বাড়াতে হবে।
বাংলাদেশের বর্তমান জনসংখ্যা ১৭ কোটিরও বেশি। আর এর মধ্যে আয়কর দেন মাত্র সাড়ে ১৭ থেকে ১৮ লাখ। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের জরিপ অনুযায়ী আয় দিতে সক্ষম কমপক্ষে প্রায় এক কোটি নাগরিক। বিপুল সংখ্যক লোক এখনও প্রশাসনিকভাবে করের আওতার বাইরে। সরকারের আয়ের প্রধান উৎস হলো রাজস্ব খাত। আর সেটা আসে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড থেকে। আমাদের দেশে রাজস্ব খাত এখনও অনেক দুর্বল ব্যবস্থায় চলছে। দক্ষ জনশক্তির অভাব, আইনী সীমাবন্ধতা, অনিয়ম-অব্যবস্থাপনা, প্রয়োজনীয় জনবলের অভাব, যত্রতত্র বদলি ও পদায়নসহ নানা ধরণের সমন্বয়হীনতা সমস্যা তো রয়ে গেছে। আধুনিক বিশ্বে রাজস্ব উন্নয়নের বিষয়ে বিভিন্ন দেশ রাজনীতির কাছাকাছি অবস্থানে থাকে। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর’র) চেয়ারম্যান বেশিরভাগই থাকেন নন-টেকনিক্যাল। যেমন বলা যেতে পারে বাংলাদেশের প্রশাসনের অভ্যন্তরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব ক্যাডারের কর্মকর্তারা পররাষ্ট্র সচিব হয়ে থাকেন। আইন ও বিচারিক অভিজ্ঞতার আলোকে জেলা জজের পক্ষ থেকে আইন ও বিচার মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবে পদস্থ হয়ে থাকেন। কিন্তু কর ও শুল্ক ক্যাডার সাধারণত কোয়াসি জুডিশিয়াল সার্ভিসের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা, অর্থাৎ কমিশনার কিংবা সদস্যদের পক্ষ থেকে সচিব পর্যায়ে এনবিআর চেয়ারম্যান পদে পদস্থ হলে রাজস্ব উন্নয়ন তথা আহরনে ব্যাঘাত ঘটবে না।
চলতি অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড থেকে রাজস্ব প্রাপ্তি ধরা হয়েছে ৫৮ দশদিক ১ শতাংশ আর করবহির্ভূত খাত থেকে প্রাপ্তি ধরা হয়েছে মাত্র ২ দশমিক ৬ শতাংশ। আর জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের আওতায় সর্বাধিক রাজস্ব আসে মূল্যসংযোজন কর (ভ্যাট) থেকে। আর এই ভ্যাট ফাঁকির প্রবণতা বেশি। প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকা ভ্যাট ফাঁকি দিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। অপরদিকে রাজস্ব বা আয় কর না দেয়ার একটা প্রবণতা রয়েই গেছে। সক্ষম করদতাদের মধ্যে কর প্রদান না করা যেন একটি মামুলি ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। লক্ষ্যনীয় বিষয় হলো, বড় বড় করদাতারা কর প্রদানে নানা দিক দিয়ে টালবাহানা করেন, এক পর্যায়ে তারা আদালতের আশ্রয় নেন। সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী উচ্চ আদালতে রাজস্ব সংক্রান্ত মামলার সংখ্যা ৯ হাজারের বেশি যার বিপরীতে রাজস্বের পরিমাণ প্রায় সাড়ে ২৪ হাজার কোটি টাকা। সক্ষম ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কর না দেয়া, কর প্রদানে টালবাহানা, রাজস্ব ফাঁকির প্রবণতা বেড়েই চলছে। এটা দেশের জন্য কোনো ইতিবাচক অবস্থা নয়। বিশ্বের উন্নত দেশ বা প্রতিবেশী স্বল্পোন্নত দেশেও করদাতারা স্বইচ্ছায় বা স্ব-উদোগে কর প্রদান কর প্রদান করে থাকেন। তারা কর প্রদানকে যেমন নাগরিক দায়িত্ব বলে মনে করেন। তারা আরো মনে করেন যে, সরকারকে রাজস্ব প্রদান একটি সম্মানজনক অধ্যায়।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড রাজস্ব বৃদ্ধির লক্ষ্যে নানামুখি পদক্ষেপ নিয়ে থাকে এবং করদাতাদের কর প্রদানে নানা উদ্যোগও নিচ্ছে। তবে রাজস্ব বোর্ডের কিছু আইনী জঠিলতাও আছে। যার কারণে রাজস্ব বোর্ড ইচ্ছা থাকলেও অনেক সময় প্রয়োজনী ও সময়োপযোগি বিশেষ পদক্ষেপও নিতে পারে না। তাদের আইনী সীমাবন্ধতার কারণে কর ফাঁকিবাজদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনী ব্যবস্থাও নিতে পারে না। জনবল সংকটের মুখে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড প্রয়োজনীয় জনবলও নিয়োগ দিতে পারে না। রাজস্ব বোর্ড সূত্রে জানা যায়, ১০ হাজারের অধিক জনবল তাদের প্রয়োজন যা ইতোপূর্বে সরকারের উর্ধ্বতন মহলকে জানানো হয়েছে। রাজস্ব বোর্ডে জনবল সংকটের কারণে সমস্যায় আছে বলেও জানা গেছে। অনেক ক্ষেত্রেই জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সীমাবন্ধতা রয়েছে। যেহেতু বোর্ড সরাসরি সরকার বা অর্থমন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণে, সেহেতু কর ব্যবস্থা সংস্কারের জন্য ন্যাশনাল ফিন্যান্স করর্পোরেশন নামে একটি রাজস্ব কমিশন গঠন সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে। ইতোপূর্বে দেশের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদের পক্ষ থেকে এমন দাবিও করা হয়েছিল। অর্থনীতিবিদদের দাবির প্রেক্ষিতে অর্থমন্ত্রী রাজস্ব ও ব্যাংকিং খাতে আলাদা দু’টি রাজস্ব কমিশন গঠনের কথাও বলেছিলেন। মন্ত্রী বলেছিলেন, ফিন্যানশিয়াল সাইড দেখার জন্য একটি, রাজস্ব সাইড দেখার জন্য আরেকটি, অর্থাৎ পৃথক দু’টি কমিশন গঠন করা হবে। কিন্তু এখনও সরকার সে বিষয়ে তেমন কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে না।
অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন যে, “রাজধানী ঢাকায় অনেক ফ্লাট আছে। কিন্তু এগুলো রেজিস্ট্রেশন হয় না। রেজিস্ট্রেশন ফি স্ট্যাম্প ডিউটি এত বেশি যে কেউ সহজে রেজিস্ট্রেশন করতে চায় না। আমরা এগুলো যদি একটু সহনশীল হই, তাহলে অনেক লাভ হবে”। রাজধানী ঢাকায় বাড়ি ও ফ্লাটের সংখ্যা কত, এর কোনো হিসাব নেই। বাড়ি-গাড়ির সংখ্যা বেড়েই চলছে। যারা বাড়ি-গাড়ির মালিক, তাদের কর প্রদানের সক্ষমতা আছে। কিন্তু তারা করদাতাদের বাইরে রয়েছেন। তাদের করের আওতায় আনা দরকার, দরকার এ বিষয়ে জরিপ চালানো এবং কর প্রদানে জনমনে উৎসাহিত করা। জনবলের সংকটেই হউক বা অন্য কোনো কারণেই হউক, তাদের করের আওতায় আনা যাচ্ছে না। এককথায় বলতে গেলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড নানা সমস্যায় রয়েছে। এমতাবস্থায়, রাজস্ব বাড়াতে একটি ‘স্বাধীন রাজস্ব কমিশন’ গঠন অত্যন্ত জরুরি। সরকার বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে জরুরিভিত্তিতে ব্যবস্থা নেবেন, বলে সংশ্লিষ্ট অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন। আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি রাষ্ট্রের রাজস্ব উন্নয়ন হলে দেশের সার্বিক উন্নয়ন বেগবান হবে। প্রত্যেক নাগরিককে রাজস্ব প্রদানে উদ্ভুদ্ধ করা সরকারের পদ্ধতিগত একটি নৈতিক দায়িত্ব।

লেখক : বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক কর কমিশনার ও পরিচালক, বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কমিশন