রানা প্লাজা ধস : আট বছরেও ২ মামলার অগ্রগতি নেই

0
0

নিজস্ব প্রতিবেদক
ভয়াবহ রানা প্লাজা দুর্ঘটনার আট বছর পূর্তি আজ। ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল ঢাকার অদূরে সাভারে ঘটে এই মানবিক বিপর্যয়। আটতলা বিশিষ্ট বাণিজ্যিক ভবন রানা প্লাজা ধসে নিহত হন এক হাজার ১৩৪ জন পোশাককর্মী। আহত হন আরও প্রায় দুই হাজার।
নিহত ১১শ’ শ্রমিকের স্মরণে মোমবাতি প্রজ্জ্বল করেছে হতাহত শ্রমিকদের স্বজনরা ও বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন । শুক্রবার সন্ধ্যায় ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের পাশে রানা প্লাজার বেদির সামনে মোমবাতি জালিয়ে তাদের শ্রদ্ধা জানানো হয়।
এ সময় নিহত ও নিখোঁজ শ্রমিকদের স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে রানা প্লাজা এলাকা। এ ছাড়া নিহত শ্রমিকদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করে দোয়ার আয়োজন করা হয়।
এ ঘটনায় হত্যা ও ইমারত নির্মাণ আইনে দুটি মামলা দায়ের হয়। যদিও মামলার এখনো কোনো কূল-কিনারা হয়নি।
প্রায় পাঁচ বছর আগে এই দুই মামলার অভিযোগ গঠন করে সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য দিন ধার্য করেন বিচারিক আদালত। কিন্তু নির্মম বাস্তবতা হলো, দুই মামলায় এখন পর্যন্ত একজনেরও সাক্ষ্যগ্রহণ সম্ভব হয়নি। স্থগিতাদেশ থাকায় সাক্ষ্য দিতে পারছে না রাষ্ট্রপক্ষ। ফলে আলোচিত মামলা দুটির বিচারিক কার্যক্রম শুরুর ‘গেরো’ কবে খুলবে, তা নিয়েই প্রশ্ন সচেতন মহলের।
আদালত সূত্র জানায়, হত্যা মামলায় অভিযোগ গঠনের পর এর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতে যান আটজন আসামি। এদের মধ্যে ছয়জনের আবেদন নিষ্পত্তি হয়। দুই আসামি সাভার পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কমিশনার হাজি মোহাম্মদ আলী ও সাভার পৌরসভার সাবেক মেয়র মো. রেফাতউল্লাহর পক্ষে করা আবেদনে মামলার বিচারিক কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে। তাদের আবেদন নিষ্পত্তি না হওয়ায় এখনো হত্যা মামলার সাক্ষ্য নিতে পারছে না রাষ্ট্রপক্ষ। আসামিদের আবেদন নিষ্পত্তির জন্য চারবার অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে চিঠি দিয়েও কোনো কাজ হয়নি।
অপরদিকে ইমারত নির্মাণ আইনের মামলায় জেলা ও দায়রা জজ আদালতে কয়েকজন আসামি রিভিশন আবেদন করেন। এদের মধ্যে আসামি ফ্যান্টম অ্যাপারেলস লিমিটেডের চেয়ারম্যান মুহাম্মদ আমিনুল ইসলামকে মামলাটি থেকে অব্যাহতি দিয়েছেন আদালত। বাকিদের রিভিশন আবেদন নিষ্পত্তি না হওয়ায় এ মামলায়ও সাক্ষ্য শুরু করতে পারছে না রাষ্ট্রপক্ষ।
হত্যা মামলার বিষয়ে ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের ভারপ্রাপ্ত পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) মিজানুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, ‘অভিযোগ গঠনের পর আটজন আসামি উচ্চ আদালতে গিয়ে মামলাটি স্থগিতের আবেদন করেন। তাদের মধ্যে ছয়জনের আবেদন নিষ্পত্তি হয়েছে। দুই আসামি সাভার পৌরসভার সাবেক মেয়র মো. রেফাত উল্লাহ এবং ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কমিশনার হাজি মোহাম্মদ আলীর পক্ষের আবেদন এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। তাদের আবেদনের ফলে মামলার কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে। আবেদন নিষ্পত্তির জন্য অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিসে চার বার চিঠি দেয়া হয়েছে জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পিপি অফিস থেকে। চিঠি দেয়ার পরও কোনো কাজ হয়নি। তাই মামলার বিচার প্রক্রিয়ার কোনো অগ্রগতি হচ্ছে না।’
ইমারত নির্মাণ আইনে দায়ের করা মামলা প্রসঙ্গে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আনোয়ারুল কবির বাবুল বলেন, ‘কয়েকজন আসামি অভিযোগ গঠনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রিভিশন আবেদন করেন। তাদের মধ্যে নিউ ওয়েব বটমস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বজলুস সামাদ ও সাবেক সহকারী প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমানের রিভিশন আবেদন নামঞ্জুর করেছেন আদালত। অপরদিকে ফ্যান্টম অ্যাপারেলস লিমিটেডের চেয়ারম্যান মুহাম্মদ আমিনুল ইসলামের রিভিশন মঞ্জুর করে তাকে অব্যাহতি দেয়া হয়। রিভিশনের বিষয়টি নিষ্পত্তি হলে এ মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু করা যাবে।’
আসামিপক্ষের আইনজীবী ফারুক আহম্মেদ বলেন, ‘রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় হত্যা ও ইমারত নির্মাণ আইনের দুই মামলায় প্রায় পাঁচ বছর আগে অভিযোগ গঠন হয়েছে। কয়েকজন আসামি উচ্চ আদালতে মামলার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রিট করেন। তাদের পক্ষে আবেদনের ফলে স্থগিতাদেশ থাকায় মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ হচ্ছে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘মামলায় ভবন মালিক সোহেল রানা ছাড়া সবাই জামিনে আছেন। মামলায় কোনো সাক্ষ্যগ্রহণ হচ্ছে না, আর আসামি রানাকে জামিনও দিচ্ছেন না আদালত। রাষ্ট্রপক্ষের উচিত দ্রুত স্থগিতাদেশ নিষ্পত্তি করে মামলার কার্যক্রম চালু করা।’
এদিকে নিহত শ্রমিকদের পরিবার ও শ্রমিক সংগঠনগুলো জানায়, রানা প্লাজা দুর্ঘটনার আট বছর অতিবাহিত হওয়ার পরও ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা হয়নি। রানা প্লাজার দুর্ঘটনায় সরকার কোনোভাবেই দায় এড়াতে পারে না। এটাকে দুর্ঘটনা বললে ভুল হবে, এটা একটি হত্যাকাণ্ড। ক্ষতিগ্রস্ত সবার প্রয়োজনীয় সহায়তা, পুনর্বাসন এবং আহতদের দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা দেয়ারও আহ্বান জানান তারা।
শ্রমিক নেতারা আরও জানান, রানা প্লাজার এই ভবনে শুধু রানার কারখানাই ছিল না, এখানে আরও কয়েকজন মালিকের কারখানা ছিল। সেই কারখানাগুলোর মালিকরা কৌশলে সব রানার ওপর ফেলে দিয়েছে। এখন রানা জেলে বাকি মালিকরা অনায়াসে বিভিন্ন স্থানে কারখানা চালিয়ে যাচ্ছেন। সবাইকে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার জোর দাবি জানাচ্ছি।
মোমবাতি প্রজ্জ্বলনে উপস্থিত ছিলেন গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়নের সাংগঠনিক সম্পাদক খায়রুল মামুন মিন্টু, গার্মেন্টস শ্রমিক সমন্বয় পরিষদের সভাপতি রফিকুল ইসলাম সুজনসহ আরও অনেকই।