রোহিঙ্গাদের জোরপূর্বক অভিবাসী বানাচ্ছে বর্মি সেনারা

0
1

কক্সবাজার প্রতিনিধি
নানান শর্ত জুড়ে দেয়া ‘এনভিসি’ কার্ড নিতে আবারও রাখাইনে থাকা রোহিঙ্গাদের উপর চাপ সৃষ্টি করছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। মিয়ানমারে থাকা অবশিষ্ট রোহিঙ্গাদের দেশছাড়া করতে ইতোমধ্যে বিদেশী নাগরিক হিসেবে নাম তালিকাভুক্ত করতে অভিবাসন ‘এনভিসি’ কার্ড নিতে চাপ দেয়া হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে চলমান প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া অকার্যকর হয়ে যেতে পারে এবং নতুন করে বাস্তুচ্যুত হতে পারে রোহিঙ্গারা।
বৃহস্পতিবার থেকে রাখাইনে মংডু শহর নয়াপাড়া গ্রামে সেনা ক্যাম্প স্থাপন করে রোহিঙ্গাদেরকে ‘এনভিসি’ কার্ড নেয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করছে। গত কয়েকদিনের মধ্যে রাখাইনের বুচিডং এলাকায় রোহিঙ্গা মুসলিম যুবকদের ধরে নিয়ে যায়। তারা এনভিসি কার্ড নিতে অস্বীকৃতি জানালে নির্যাতন করে হত্যা করেছে বলে অভিযোগ করছেন রোহিঙ্গারা। এর মাধ্যমে মুসলমানদের পাড়ায় পাড়ায় চেকপোস্ট বসিয়ে হয়রানি করছে সেনারা। সেদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের মাঝে ভয়ভীতি সৃষ্টি করতে সেনা টহল জোরদার করেছে পুরো রাখাইন জুড়ে।
সীমান্তের স্থানীয়দের মতে, মিয়ানমারের সামরিক শাসকরা অতীতেও এভাবেই রোহিঙ্গাদের বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত করতে নানা অজুহাতে বার বার রোহিঙ্গাদেরকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য করেছে। এবারো তার ব্যতিক্রম হবে না বলে মনে হচ্ছে। এই পরিস্থিতি রোহিঙ্গা এবং বাংলাদেশের জন্য বেশ উদ্বেগজনক।
১৯৬২ সাল থেকে রাখাইন থেকে রোহিঙ্গাশূন্য করতে রোহিঙ্গাদের বাস্তুচ্যুত করার মিয়ানমার সেনাবাহিনী নীলনকশা করছে। শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়নের সেই পথে হাঁটছে। এখনই বাংলাদেশ কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে রাখাইনকে রোহিঙ্গাশূন্য করে অবশিষ্ট রোহিঙ্গাদেরকে বাস্তুচ্যুত করবে।
রোহিঙ্গাদের মতে, মিয়ানমারে সেনা অভ্যুত্থানের পরপরই রাখাইনকে পুরোপুরি রোহিঙ্গাশূন্য করার নকশা করছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। রাখাইন রোহিঙ্গাশূন্য করে চীন এবং ভারত লাভবান ব্যবসায়িক সুযোগ দিতে চায় মিয়ানমার সামরিক জান্তা সরকার।
বর্তমানে রাখাইন রাজ্যে অবস্থানরত প্রায় ছয় লক্ষাধিক রোহিঙ্গার ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন এপার-ওপারে থাকা তাদের স্বজনরা। উখিয়া-টেকনাফ ক্যাম্পে থাকা রোহিঙ্গাদের সূত্র জানায়, রাখাইনে থাকা রোহিঙ্গারা এপারে পালিয়ে আসার জন্য তাদের স্বজনদের কাছে নিয়মিত যোগাযোগ করছে।
সীমান্ত এলাকার লোকজন জানিয়েছে, বাংলাদেশ সীমান্তে তুমব্রু ও ঘুমধুম সীমান্তের ওপারে মিয়ানমারের সেনা তৎপরতা বেড়েছে। সেনারা সীমান্ত এলাকায় নতুন করে চৌকি নির্মাণ করে সীমান্তে অবস্থান নিয়েছে বলেও জানিয়েছে সীমান্তের প্রত্যক্ষদর্শীরা।
মিয়ানমারে সেনা অভ্যুত্থানের পর গত পাঁচ দিন ধরে সীমান্ত এলাকায় বসবাসকারী লোকজনও সতর্ক রয়েছে।
কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফের ক্যাম্পে কয়েকজন রোহিঙ্গা জানিয়েছেন, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে থাকা রোহিঙ্গারা সীমান্তের পরিস্থিতি নিয়ে এপারে থাকা স্বজনদের কাছে খবরাখবর রাখছেন। এ কারণে শিবিরের রোহিঙ্গাদেরও শঙ্কা, সে দেশের পরিস্থিতি খারাপের দিকে গড়ালে তারা সীমান্ত পার হয়ে বাংলাদেশে আবারো দলে দলে ঢুকে পড়তে পারে।
টেকনাফের শালবাগান শিবিরের মোহাম্মদ আলী আজম নামের একজন রোহিঙ্গা বলেন, মিয়ানমারের বুচিডং এলাকায় তাদের ঘরবাড়ি, ব্যবসা ছিল। গত ২০১৭ সালের আগস্টে পরিস্থিতি খারাপ দেখে পরিবার নিয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে ক্যাম্পে আশ্রয় নিলেও তাদের চাচা, ভাইসহ অনেক আত্মীয়স্বজন তখন থেকে ঝুঁকি নিয়ে সেখানে রয়ে গেছে। গত ১ ফেব্রুয়ারি সামরিক অভ্যুখানের পরপরই আবারো সেনাবাহিনী রাস্তায় ব্যারিকেড দিয়ে মুসলিম মহল্লাগুলো অবরুদ্ধ করে রেখেছে। অভিবাসন এনভিসি কার্ড নেয়ার জন্য যুবকদেরকে ধরে নিয়ে নির্যাতন করছে। অনেকে নির্যাতনে মৃত্যুর খবরও পেয়েছি। তারা বাংলাদেশে থাকা আত্মীয়স্বজনদেরকে এদেশে চলে আসতে তাদের কাছে বার বার পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাচ্ছে।
টেকনাফের লেদা রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নেতা মোহাম্মদ আলম, কুতুপালং ক্যাম্পে আব্দুল হামিদ ও নুর মোহাম্মদ একই অভিযোগ করেছেন।
মিয়ানমারে সেনা অভ্যুত্থানের পর রোহিঙ্গাদের উপর এই চাপ সৃষ্টি করে নতুন করে রোহিঙ্গাদের নির্যাতন শুরু করার ফন্দি করছে। ১৯৮২ সালে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব বাতিল করে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন নামে সামরিক অভিযান চালিয়ে বাস্তুচ্যুত করে আসছে। ফলে প্রায় অর্ধ কোটি রোহিঙ্গা বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন স্থানে রাষ্ট্রবিহীন নাগরিক হিসেবে অবস্থান করছে।
সর্বশেষ ২০১৭ সালের আগস্ট মিয়ানমারে সামরিক বাহিনী মুসলমান রোহিঙ্গা অধ্যুষিত রাখাইন রাজ্যে নির্বিচারে গণহত্যা ও নির্যাতনের মুখে দেশটি থেকে সাড়ে সাত লাখ এবং এর আগেও বিভিন্ন সময়ে পালিয়ে আসা চার লাখসহ প্রায় সাড়ে ১১ লাখ রোহিঙ্গা এসে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। জাতিসংঘের সহযোগিতায় কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়ায় তাদের জন্য শরণার্থী ক্যাম্প খোলা হয়েছে। এমন সময় তাদের স্বদেশে ফেরত পাঠাতে চীনের মধ্যস্থায় আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছিল। এ অবস্থায় গত ১ ফেব্রুয়ারি মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানের পর আবারো নতুন করে রোহিঙ্গাদের উপর নিপীড়ন শুরুর আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। ফলে উখিয়া-টেকনাফ শরণার্থী ক্যাম্পে অবস্থানরত স্বদেশে প্রত্যাবাসন অনিশ্চিতের পাশাপাশি আবারে নতুন করে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের আশঙ্কা করছে স্থানীয়রা।
মিয়ানমারে সেনা অভ্যুত্থানের পরে নতুন করে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঘটতে পারে এমন আশঙ্কায় সীমান্তে বাড়তি নজরদারি বাড়িয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। এছাড়া মিয়ানমার সীমান্তবর্তী বাংলাদেশের পানিসীমায় নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডের টহল জোরদার করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমারে সামরিক বাহিনী মুসলমান রোহিঙ্গা অধ্যুষিত রাখাইন রাজ্যে নির্বিচারে গণহত্যা ও নির্যাতন চালানোর কারণে দেশটি থেকে কমপক্ষে সাত লাখ রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নিয়েছে। এর আগেও
বিভিন্ন সময়ে দেশটি থেকে আরো চার লাখের বেশি রোহিঙ্গা এসে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। জাতিসঙ্ঘের সহযোগিতায় কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়ায় তাদের জন্য শরণার্থী শিবির খোলা হয়েছে। তাদের দেশে ফেরত পাঠাতে অব্যাহত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সরকার। এ অবস্থায় মিয়ানমার থেকে নতুন করে আর কাউকে আশ্রয় দিতে আগ্রহী নয় সরকার।