সমাজের সবচেয়ে অবহেলিত গোষ্ঠী হরিজন সম্প্রদায়

0
37

শিমুল আহসান

আমাদের সঙ্গে ফ্রি প্রাইমারী স্কুলে ক্লাস ওয়ানে পড়তো মাসুয়া নামের লাজুক একটি হরিজন সম্প্রদায়ের ছেলে। ক্লাস থ্রি পর্যন্ত মাসুয়া ওই স্কুলে পড়েছিলো। আমরা যখন বড় হলাম, ওর সঙ্গে দেখা হতো কিন্তু আমার সঙ্গে কথা বলতো না। একবার আব্বার সঙ্গে বাবার অফিসে গিয়েছি, দেখি মাসুয়া আর ওর বাবা আব্বার অফিস রুম পরিস্কার করছে। আব্বাকে বললাম, আব্বা ওই ছেলেটির নাম মাসুয়া, ও আর আমি একই ক্লাসে, একই স্কুলে পড়ি। ওর বাবার নাম ছিলো ভীম অথবা পাচু। আব্বা মাসুয়াকে ডেকে আটআনা পয়সা দিয়েছিলেন, মনে আছে।
সমাজে প্রচলিত জাতিভেদ প্রথার কারণেই দেশের সাধারণ মানুষদের থেকে আলাদা হয়ে গেছে হরিজন সম্প্রদায়। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যাবে, সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে জাতিভেদ প্রথাটির বিষবৃক্ষ রোপণ করতে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিল আর্যরা। তারপর বিভিন্ন শাসকগোষ্ঠী ক্রমাগত সেই জাত-পাতের বিভাজন করেই গেছেন। এই বিভাজন সামাজিকভাবে এমন নির্যাতনে রূপ নিয়েছিল যে, সমাজে নিম্নবর্ণের মানুষের টেকাই দায় হয়ে উঠেছিল। তাদের অস্তিত্বের সংকট শুরু হয়ে যায় রীতিমতো। ভারতবর্ষে এই বিভাজনের মধ্য দিয়ে বিস্তৃতি ঘটে বিভিন্ন ধর্মের। কিন্তু জাতিভেদের সংকট পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত কিংবা বাংলাদেশ থেকে আজও যায়নি। ইতিহাসে সোনার অক্ষরে নয়, কান্নার নীল হরফে লেখা রয়েছে দলিত সম্প্রদায়ের কথা।
হরিজন কথাটির উৎপত্তির সাথেও মিশে আছে প্রহসনের গল্প। সত্যাগ্রহ আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা মহাত্মা গান্ধী দলিতদের মেথর, সুইপার না বলে ‘হরিজন’ বলার অমোঘ বাণী দিয়ে গেছেন। কিন্তু তাদের সমাজ ও সামাজিকতার স্বীকৃতি দেননি, মূল সমাজের সঙ্গে যুক্ত করেননি। ক্ষমতা যখন যার হাতে থাকে, তখন সেই শাসক জাত-পাতের ভেদাভেদ ভুলিয়ে দেয়ার মন্ত্র মুখে উচ্চারণ করলেও, বিভাজন টিকিয়ে রাখার জন্য একটি শাসক শ্রেণী ঠিকই তৈরি করে দিয়ে গেছেন। মহাত্মা গান্ধীর ‘হরিজন’ তার একটি প্রকাশ মাত্র। দেবদাসী প্রথা দক্ষিণ ভারতে এখনো টিকে আছে। এসব দেবদাসীরা অধিকাংশই হরিজন সম্প্রদায়ের থেকে আসা। ব্রাহ্মণরা তাদের দিনের পর দিন ভোগ করে। তাতে অবশ্য ব্রাহ্মণদের জাত যায় না, জাত যায় হরিজনদের হাতের জল পান করলে, অন্ন গ্রহণ করলে।
বাংলাদেশের দলিত সম্প্রদায়, যারা মূলত হরিজন নামে পরিচিত, এখনো সমাজের মূল স্রোতের সঙ্গে মিশতে পারেনি। কলোনিভিত্তিক জীবনযাপন করে যাচ্ছে ব্যাপক অভাব-অনটনে। ঢাকা শহরের একটু বাইরে গেলেই দেখা যাবে দলিত-হরিজনরা যেন অস্পৃশ্য। তারা পানি খেতে দোকানে গেলেও আলাদা করে গ্লাস নিয়ে যেতে হয়। দক্ষিণবঙ্গে হরিজনরা কোনো বাড়িতে খেতে গেলে তাদের কলাপাতায় খাবার পরিবেশন করা হয়। এ অবস্থার পরিবর্তন না হলে দেশের বৃহৎ একটি জনগোষ্ঠীর রাষ্ট্রীয় অবদানকে অস্বীকার করা হবে। তাদের মূলধারায় সংযোজিত করা জরুরি। না হলে তারা শিক্ষিত হলেও এখনো যে অচ্ছুৎ হয়ে রয়েছে, সেই অচ্ছুৎই রয়ে যাবে।
জন্ম ও পেশাগত কারণে বৈষম্য এবং বঞ্চনার শিকার মানুষরা আন্তর্জাতিক পরিসরে বিশেষ করে ঐতিহাসিক বা পণ্ডিতদের কাছে ‘দলিত’ নামে পরিচিতি পায়। তারই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশে দুই ধরনের দলিত জনগোষ্ঠীর দেখা মেলে। একটি বাঙালি দলিত শ্রেণি, অন্যটি অবাঙালি দলিত শ্রেণি। ২০১৩ সালে মাযহারুল ইসলাম এবং আলতাফ পারভেজের গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশে বসবাসরত দলিতদের সংখ্যা বর্তমানে সাড়ে পাঁচ থেকে সাড়ে ছয় মিলিয়নের মতো। বাঙালি দলিত বলতে সমাজে যারা অস্পৃশ্যদের বোঝায়, যেমন- চর্মকার, মালাকার, কামার, কুমার, জেলে, পাটনী, কায়পুত্র, কৈবর্ত, কলু, কোল, কাহার, ক্ষৌরকার, নিকারী, পাত্র, বাউলিয়া, ভগবানীয়া, মানতা, মালো, মৌয়াল, মাহাতো, রজদাস, রাজবংশী, কর্মকার, রায়, শব্দকর, শবর, সন্ন্যাসী, কর্তাভজা, হাজরা প্রভৃতি সম্প্রদায় সমাজে অস্পৃশ্যতার শিকার। এসব সম্প্রদায় আবার বিভিন্ন গোত্রে বিভক্ত। ইসলাম ধর্ম জাতিভেদকে অস্বীকার করলেও এই ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে অনেকে পেশার কারণে সমাজে পদদলিত হয়ে রয়েছে, যেমন- জোলা, হাজাম, বেদে, বাওয়ালি।
ভূমিহীন ও নিজস্ব বসতভিটেহীন এসব সম্প্রদায় বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে স্থানীয় সরকার কর্তৃক প্রদত্ত জমি, রেলস্টেশনসহ সরকারি খাস জমিতে বসবাস করছে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো : হেলা, মুচি, ডোম, বাল্মিকী, রবিদাস, ডোমার, ডালু, মালা, মাদিগা, চাকালি, সাচ্চারি, কাপুলু, নায়েক, নুনিয়া, পরাধন, পাহান, বাউরি, বীন, বোনাজ, বাঁশফোর, ভূঁইয়া, ভূমিজ, লালবেগী, জনগোষ্ঠী। এসব জনগোষ্ঠী তেলেগু, ভোজপুরী, জোবালপুরী, হিন্দি, সাচ্চারি ও দেশওয়ালি ভাষায় কথা বলে। এই সম্প্রদায়গুলোই মূলত অবাঙালি দলিত শ্রেণি।
হরিজন কথাটির উৎপত্তির সাথেও মিশে আছে প্রহসনের গল্প। সত্যাগ্রহ আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা মহাত্মা গান্ধী দলিতদের মেথর, সুইপার না বলে ‘হরিজন’ বলার অমোঘ বাণী দিয়ে গেছেন। কিন্তু তাদের সমাজ ও সামাজিকতার স্বীকৃতি দেননি, মূল সমাজের সঙ্গে যুক্ত করেননি। ক্ষমতা যখন যার হাতে থাকে, তখন সেই শাসক জাত-পাতের ভেদাভেদ ভুলিয়ে দেয়ার মন্ত্র মুখে উচ্চারণ করলেও, বিভাজন টিকিয়ে রাখার জন্য একটি শাসক শ্রেণি ঠিকই তৈরি করে দিয়ে গেছেন। মহাত্মা গান্ধীর ‘হরিজন’ তার একটি প্রকাশ মাত্র। দেবদাসী প্রথা দক্ষিণ ভারতে এখনো টিকে আছে।
বাংলাদেশের দলিত সম্প্রদায়, যারা মূলত হরিজন নামে পরিচিত, এখনো সমাজের মূল স্রোতের সঙ্গে মিশতে পারেনি। ফলে তারা কলোনিভিত্তিক জীবনযাপন করে যাচ্ছে ব্যাপক অভাব-অনটনের মধ্য দিয়ে। ঢাকা শহরের একটু বাইরে গেলেই দেখা যাবে দলিত-হরিজনরা যেন অস্পৃশ্য। এ অবস্থার পরিবর্তন না হলে দেশের বৃহৎ একটি জনগোষ্ঠীর রাষ্ট্রীয় অবদানকে অস্বীকার করা হবে। তাই তাদের সমাজের মূলধারায় সংযোজিত করার উদ্যোগ গ্রহণ করা খুব জরুরি। নাহলে তারা শিক্ষিত হলেও এখনো যে অচ্ছুৎ হয়ে রয়েছে, সেই অচ্ছুৎই রয়ে যাবে।
জন্ম ও পেশাগত কারণে বৈষম্য এবং বঞ্চনার শিকার মানুষরা আন্তর্জাতিক পরিসরে বিশেষ করে ঐতিহাসিক বা পণ্ডিতদের কাছে ‘দলিত’ নামে পরিচিতি পায়। তারই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশে দুই ধরনের দলিত জনগোষ্ঠীর দেখা মেলে। একটি বাঙালি দলিত শ্রেণি, অন্যটি অবাঙালি দলিত শ্রেণি। অবাঙালি দলিত বলতে আমরা বুঝি ব্রিটিশ শাসনামলের মাঝামাঝি (১৮৩৮-১৮৫০) বিভিন্ন সময়ে পূর্ববঙ্গে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কর্মী, চা-বাগানের শ্রমিক (১৮৫৩-৫৪), জঙ্গল কাটা, পয়ঃনিষ্কাশন প্রভৃতি কাজের জন্য ভারতের উত্তর প্রদেশ, অন্ধ্র্র প্রদেশ, মধ্য প্রদেশ, রাজস্থান, বিহার, উড়িষ্যা, কুচবিহার, রাচি, মাদ্রাজ ও আসাম থেকে হিন্দি, উড়িষ্যা, দেশওয়ালি ও তেলেগু ভাষাভাষী মানুষের পূর্ব পুরুষদের নিয়ে এসেছিল। দরিদ্র এই অভিবাসীরা দেশের সর্বত্র পরিচ্ছন্নতা কর্মী এবং সিলেটে চা-শ্রমিক হিসেবে কাজ করে।
কলোনি বা বস্তিতে বসবাসরত বাশফুরদের অবস্থা এতটাই শোচনীয় যে প্রতিবেশীরাও কখনো তাদের বাড়িতে পা রাখে না, তাদের বাচ্চাদের সাথে নিজেদের বাচ্চাদের মিশতে দেয়া না, খেলতে দেয় না, নিজেরা কথা পর্যন্ত বলে না। তাদের ছোঁয়া তো বহুদূরের কথা, তাদের সাথে পানিও বিনিময় করে না। কাজেই এলাকায় কখনো পানি বা বিদ্যুৎ না থাকলে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয় তাদের। বাংলাদেশের প্রায় ১৭ কোটি জনগণের জন্য যেখানে একই নিয়ম থাকার কথা, সেখানে হরিজনদেরকে কোনো মানুষের পর্যায়েই ফেলা হয় না।
হরিজন কলোনিতে বিশুদ্ধ খাবার পানি এবং পয়ঃনিষ্কাশনের ব্যবস্থা খুবই নাজুক। পানি সরবরাহের নলকূপগুলো প্রায় অকেজো হয়ে থাকে। ফলে পানীয় ও গোসলের পানিসহ সব ধরনের কাজে বাধ্য হয়ে দূষিত পুকুরের পানি ব্যবহার করতে হয়। এ ধরনের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের কারণে কলোনির শতকরা ৯০ ভাগ শিশু সব সময়ই পুষ্টিহীনতায় ভোগে। হরিজন কলোনিতে শিশু মৃত্যুর হারও অন্য এলাকার চেয়ে বেশি। সাম্প্রতিক সময়ে সুইপারের কাজই এদের প্রধান পেশা। হরিজন সম্প্রদায়ের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তাদের আবাসন সমস্যাও প্রকট হচ্ছে। শুরুতে যে রতন বাশফুরের কথা বলা হয়েছিল, তিনি নোয়াখালির এক সুইপার কলোনির সর্দার। তিনি বলেন, “সরকার আমাদের কলোনিগুলো বানিয়েছে শ্মশানের পাশে, লাশ কাটা ঘরের পাশে, আবর্জনা স্তূপের মধ্যে। আমাদের দিয়ে তারা সারা শহর পরিষ্কার করিয়ে নেয়, আর আমাদেরই রেখে দিয়েছে নোংরা জায়গায়।”
দুঃখকষ্ট যে মানুষের মন থেকে খুশির আমেজ কেড়ে নিতে পারে না তার উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হরিজনরা। খুবই উৎসবপ্রবণ একটি সম্প্রদায় এরা। বারো মাসে তের পার্বণ তো আছেই, তাছাড়াও দোল উৎসব, কালী পূজা, দুর্গা পূজা, হুলকা পূজা, সূর্য পুপায়া প্রভৃতি অনুষ্ঠানে খুবই আনন্দ করে তারা। সাংস্কৃতিকভাবেও তারা এগিয়ে রয়েছে অনেকখানি। কিন্তু সমাজের মূল স্রোতের সঙ্গে কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা না থাকায় তাদের উৎসব বা লোকাচার সম্পর্কে কোনো ধারণাই নেই আমাদের। হরিজনদের মধ্যে রয়েছে মানসম্পন্ন কণ্ঠশিল্পী ও যন্ত্রশিল্পী। এষব শিল্পীরা জাতীয়ভাবে অংশগ্রহণের সুযোগ পেলে দেশের সংস্কৃতির জন্যও সেটা হতো ফলপ্রসূ। মোজাইক আর টাইলসে মোড়া ঘরে থেকে, ল্যাপটপ বা স্মার্টফোনে এই লেখাটি পড়তে পড়তে আমরা হয়তো কল্পনাও করতে পারবো না, রাস্তার পাশে ময়লা ফেলা কিংবা মর্গে লাশকাটা ডোমের জীবনে কী কী ঘটে চলেছে।
সংস্কৃত ভাষা থেকে আগত দলিত কথাটির মানে হচ্ছে সমাজের উচ্চবর্গীয় জনগণ দ্বারা নিপীড়িত ও নির্যাতিত জনগোষ্ঠী। সে কথাটিকে আরও একটু পোক্ত করতে তাদের বাশফুর জাতীয় পদবীই যথেষ্ট। নাম শুনেই মানুষ বুঝে ফেলে এদের সাথে যা ইচ্ছে তা-ই করা সম্ভব।
হরিজন পল্লী বাংলাদেশের বাইরের কোনো এলাকা নয়। হরিজনরাও আমাদের দেশের, সংস্কৃতিরই একটি অংশ। সাম্প্রতিক কিছু গবেষণায় জানা গেছে, হরিজনদের অনেকে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিলেও তারা পাননি মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট, তাদের দেয়া হয়নি কোনো ভাতা। বাংলাদেশে বসবাসকারী প্রায় ছয় মিলিয়ন হরিজনদের এভাবে দূরে ঠেলে রেখে আমরা কি সত্যিই পারবো দেশের সামগ্রিক উন্নতি ঘটাতে?
লেখক : কবি ও কলামিস্ট