সাহিত্যের বাতিঘর অভিযাত্রিক

0
1

সাঈদ সাহেদুল ইসলাম :

অপসংস্কৃতির করাল গ্রাস থেকে সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে পরিশোধিত করার লক্ষ্যে ৫ মে ১৯৭৮ সালে রংপুরের বেতপট্টি (বর্তমান টাইম হাউস সংলগ্ন) জনাব শামসুল হক লাল-এর মালিকানাধীন কাঠের দোতলায় প্রতিষ্ঠিত হয় অভিযাত্রিক সাহিত্য ও সংস্কৃতি সংসদ। স্বাধীনোত্তর বাংলাদেশে অপসংস্কৃতি যখন শুদ্ধ সংস্কৃতির আকাশকে ঢেকে দিয়েছে তা থেকে মুক্তির আলোকবর্তিকা নিয়ে অভিযাত্রিক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়া হয়। মূল স্লোাগান “অপসংস্কৃতি প্রতিরোধ, সুস্থ ও মননশীল সাহিত্যচর্চা”। কাঠের দোতলা থেকে অভিযাত্রিক স্থানান্তরিত হয় অভিযাত্রিকের সিনিয়র সহ-সভাপতি বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও কবি মোয়াজ্জেম হোসেন তাব্বাসীর মুলাটোলের বাসায়। সেখানে তাব্বাসী সাহেবের আন্তরিকতায় প্রায় তিন বছর চলে অভিযাত্রিকের যাবতীয় কর্মসূচী। পরে রংপুর জেলা পরিষদ ডাকবাংলোর ১ নং কক্ষে অবস্থান নেয় রংপুরের তৎকালীন জেলা প্রশাসক ও কবি মোসাদ্দেক আলীর আন্তরিক সহায়তায়। তিনি মাঝে মাঝেই অভিযাত্রিক সাপ্তাহিক সাহিত্য আসরে যোগ দিতেন এবং কবিতা পাঠ করতেন। সময়ের স্রোতধারায় অভিযাত্রিকের ঠিকানা আবারও বদলে যায়। রংপুর টাউন হল চত্বরে অভিযাত্রিক নতুন উদ্যমে কার্যক্রম শুরু করে।
প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি দেশের বিশিষ্ট গবেষক ও ইতিহাসবিদ ভাষাসৈনিক অধ্যাপক মোতাহার হোসেন সুফী আর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক থাকেন একেএম শহীদুর রহমান। পরে স্থানীয় দৈনিক যুগের আলো পত্রিকার সম্পাদক এম আয়েনুজ্জামান এবং তারও পরে কথাশিল্পী এম এ বাশার অভিযাত্রিক’-এর সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। অভিযাত্রিকের বর্তমান সভাপতি কলমসৈনিক রানা মাসুদ এবং সাধারণ সম্পাদক সাঈদ সাহেদুল ইসলাম।
অভিযাত্রিকের আসর ও বিভিন্ন কর্মকাণ্ডকে সমৃদ্ধ করেছেন বা অভিযাত্রিক থেকে সম্মাননা পেয়েছেন দেশ বিদেশের অনেক বরণ্যে গুণী ব্যক্তি। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য সাবেক রাষ্ট্রপতি হোসাইন মোহাম্মদ এরশাদ, ডঃ আবুল কালাম মনজুর মোর্শেদ, ডঃ আনিসুজ্জামান, ডঃ আলাউদ্দিন আল আজাদ, কণ্ঠশিল্পী ফেরদৌসী রহমান, ডঃ আশরাফ সিদ্দিকী, শিল্পী মোস্তফা জামান আব্বাসী, আসমা আব্বাসী, কাজী হাসান আহমেদ (বর্তমান বিভাগীয় কমিশনার, রংপুর), সৈয়দ শামসুল হক, ডঃ গোলাম সাকলাইন, ডঃ আবুল কাশেম, ডঃ উইলিয়াম রাডিচি (বিভাগীয় প্রধান, সংস্কৃতি, লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়, লন্ডন), জাফরী জোবায়েদ (লন্ডনস্থ ভূমিকা থিয়েটারের পরিচালক), জ্যাকী জ্যাকসন (লণ্ডনের নাট্য অভিনেত্রী), মার্টিন পাওয়েল (সংগীত বিশেষজ্ঞ, লন্ডন), ড. আনোয়ার হোসেন, ড. নাশিদ কামাল, সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নুর, কবি কাজী রোজী, প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান, ড. হামিদা বানু শোভা, ড. নূরুল হুদা, আব্দুলাহ আবু সায়ীদ, কবি কায়সুল হক, নাসির আহমেদ, বিপ্রদাস বড়ুয়া, সায্যাদ কাদির, জাহানারা বেগম, রোমেনা আফাজ, আসাদ চৌধুরী, মঞ্জু সরকার, মহেশচন্দ্র রায়, সৈয়দ নাজাত হোসেন, নূর হাসনা লতিফ, শামসুন নাহার জামান লেখক ও সাংবাদিক গোলাপ মুনীর, কবি সমুদ্রগুপ্ত, নন্দিনী সাহিত্য ও পাঠচক্রের সম্পাদক সুলতানা রিজিয়া, মিয়া মোঃ আলী আকবর আজিজি, পাক্ষিক অবলোকনের উপদেষ্টা আব্দুল লতিফ মোল্লা, ফেরদৌসী রহমান বিউটি, ডাঃ জাকিউল ইসলাম ফারুকী, এটিএন বাংলার নওয়াজেশ আলী খান, জি.এম হারুন, আবু জাফর সাবু, সরোজ দেব, মাজহারুল মান্নান, হামিদ কায়সার, আসলাম সানী, আনন ফাউন্ডেশনের পরিচালক ও ছড়াকার সম শামসুল আলম, দৈনিক আমাদের সময়ের সিনিয়র সাংবাদিক ও ছড়াকার অদ্বৈত মারুত, সাবেদ আল সাদ, রবীন্দ্র গোপ, মাজেদা হক, তোফাজ্জল হোসেন, ফিরোজা মেরী, আফরোজা অদিতি, মিনু মমতাজ, পুষ্টিবিদ ও কবি আখতারুন্নাহার আলো, আকমল সরকার রাজু, মনি খন্দকার, বেগম ফাতেমা আলী রেহেনা সুলতানা শিল্পী, মানিক মজুমদার, রওশন মতিন, অনন্য আমিনুল, মাহতাব লিটন, লেখক জহুরুল কাইয়ুম, কর কমিশনার আব্দুল হক, বিশিষ্ট কবি রোকেয়া ইউসুফসহ অনেক দেশবরেণ্য গুণী ব্যক্তি।
অভিযাত্রিক বিভিন্ন শাখা রয়েছে এবং বিভিন্ন উৎসব অনুষ্ঠান পালন করে থাকে। এগুলোর মধ্যে সাপ্তাহিক সাহিত্য আসর অন্যতম। প্রতি শুক্রবার বিকেল ৪টায় অভিযাত্রিকের সাপ্তাহিক আসর কসে। ১৯৭৮ সাল থেকে বিরতিহীনভাবে চলছে এ আসর। ১৯৮৮ সালের ভয়াল বন্যার সময়েও প্রায় হাঁটু পানি জমে থাকার সময় অভিযাত্রিক কার্যালয়ে বেঞ্চের উপর বসে আসর স¤পন্ন করা হয়। পঠিত লেখাগুলো নিয়ে তাৎক্ষণিক আলোচনার পাশাপাশি লেখার মানোন্নয়নে দিক নির্দেশনা প্রদান করা হয়। প্রতি সপ্তাহে পঠিত লেখাগুলো প্রকাশ হয় অভিযাত্রিকের নিজস্ব প্রকাশনা ‘আসর’ পত্রিকায়।
গত ২৭ আগস্ট ২০২১ অভিযাত্রিক পূর্ণ করছে ২২৫৫ তম নিয়মিত সাপ্তাহিক সাহিত্য আসর যে রেকর্ড বিশ্বের কোথাও আছে বলে আমাদের জানা নেই।
অভিযাত্রিক উৎসব ও মেলারও আয়োজন করে থাকে। অভিযাত্রিকের আয়োজনে রংপুর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার চত্বর ও টাউন হলে অনুষ্ঠিত হয়েছে ১৯৯৮ সালে ৫ থেকে ৭ মার্চ রংপুর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার চত্বরে তিনদিন ব্যাপী চলে অভিযাত্রিকের “হাজারতম সাপ্তাহিক সাহিত্য আসর পূর্তি” উপলক্ষে সাহিত্য ও সংস্কৃতি উৎসব ও বইমেলা। তা’ছাড়াও অনেক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছে গত সব বছরগুলোতে। এ অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি ছিলেন বিশিষ্ট কবি ও “শৈলী পত্রিকা’র” সম্পাদক কায়সুল হক, কথা সাহিত্যিক মঞ্জু সরকার, উত্তরবঙ্গের বর্ষীয়ান কবি নূরুল ইসলাম কাব্যবিনোদ ও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক মুহম্মদ আলীম উদ্দীন। ৩ অক্টোবর ২০০৩ রংপুর শহীদ মিনারে অভিযাত্রিকের রজত জয়ন্তী, প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ও ১৩০০ তম সাপ্তাহিক সাহিত্য আসর অনুষ্ঠিত হয়। দিনব্যাপী এ অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি ছিলেন রংপুরের মাননীয় জেলা প্রশাসক আনোয়ারুল করিম, রংপুর জেলা পরিষদের প্রধান নিবাহী কর্মকর্তা সামসুজ্জামান ভূইয়া (রানা জামান), দেশবরেণ্য সাহিত্যিক মঞ্জু সরকার, উত্তরবঙ্গের বর্ষীয়ান কবি নূরুল ইসলাম কাব্যবিনোদ, রংপুর পৌরসভার চেয়ারম্যান কাজী মোঃ জুন্নুন, রংপুর চেম্বার অব কমার্স এর সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী, ঢাকার পাক্ষিক অবলোকন পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক, গোলাপ মুনীর। ২ সেপ্টেম্বর ২০০৫ এম. এ. বাশারের সভাপতিত্বে রংপুর টাউন হলে অভিযাত্রিকের ১৪০০ তম সাপ্তাহিক সাহিত্য আসর পূর্তি উৎসব, সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যাঁদেরকে সংবর্ধনা দেয়া হয়েছে তাঁরা হলেন উত্তরবঙ্গের আলোকিত পুরুষ কবি নূরুল ইসলাম কাব্যবিনোদ, লেখক ও নাট্যকার আব্দুল খালেক জোয়ারদার, কবি ও লেখক রোমেনা চৌধুরী, ঐতিহাসিক লেখক ও গবেষক ডাঃ মতিউর রহমান বসনীয়া, লেখক ও সংগঠক আবু বক্কর সিদ্দিক, কবি ও লেকক শামছুন্নাহার জামান, লেখক সমাজকর্মী ও সংগঠক হামিদা সরকার (মরণোত্তর), কবি ও গীতিকার মোয়াজ্জেম হোসেন তাব্বাসী (মরণোত্তর)। এতে সম্মানিত অতিথি ছিলেন রংপুরের জেলা প্রশাসক নজরুল ইসলাম খান, রংপুর পৌরসভার চেয়ারম্যান এ.কে.এম আব্দুর রউফ মানিক, বিশিষ্ট কবি লেখক ও সাংবাদিক সাযযাদ কাদির, বরণ্যে কবি ও কলামিষ্ট সমুদ্র গুপ্ত, কবি ও লেখক রোকেয়া ইউসুফ এবং লেখক ও গবেষক ডঃ গৌরাঙ্গ চন্দ্র মোহান্ত। ১০ ও ১১ আগষ্ট ২০০৭ দু’দিন ব্যাপী রংপুর টাউন হলে অভিযাত্রিকের ১৫০০ তম সাপ্তাহিক সাহিত্য আসর, ৩ জুলাই ২০০৯ অভিযাত্রিক’র ১৬০০ তম সাপ্তাহিক আসর, ৩ মে ২০১৩ অভিযাত্রিকের ১৮০০ তম সাপ্তাহিক সাহিত্য আসর এবং সর্বশেষ ১৯০০তম সাপ্তাহিক সাহিত্য আসর উপলক্ষ্যে এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠান ও কবি সমাবেশসহ অনেক সাহিত্যানুষ্ঠান হয়েছে।
ঋতুভিত্তিক অনুষ্ঠানঃ অভিযাত্রিক প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে ঋতুভিত্তিক অনুষ্ঠান করে আসছে। প্রতি দুই মাস অন্তর ঋতুভিত্তিক অনুষ্ঠানে সদস্যদের মধ্যে কবিতা প্রতিযোগিতা ও পুরস্কার বিতরণের ব্যবস্থা থাকে। এখন পর্যন্ত অভিযাত্রিকের এ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
নতুন লিখিয়েদের উৎসাহ ও প্রেরণা যোগাতে ১৯৮৫ সালে অভিযাত্রিক প্রকাশনা বিভাগ গড়ে ওঠে। একই সালে অভিযাত্রিকের সপ্তম প্রতিষ্ঠা প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী অনুষ্ঠানে স্বকণ্ঠে নিজস্ব কবিতা পাঠ করেন সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক।
১৯৮২ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত হয় এ. কে. এম শহীদুর রহমান বিশু’র গীতি আলেখ্য ‘নাইওরী’। একই সালে অভিযাত্রিক বাংলাদেশ টেলিভিশনে “ঝিলিমিলি” নামে একটি ব্যতিক্রমী অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে। ওই ঝিলিমিলি অনুষ্ঠানে এম. এ. বাশার রচিত “এই সবুজের দেশে” নাটকটি প্রচারিত হয়। আশির দশকে অভিযাত্রিক প্রয়োজন ও এম. এ. বাশার এর রচনায় টাউন হল মঞ্চে মঞ্চস্থ হয় নাটক “অন্ধকার সমুদ্রতীরে” ও “অন্য মানুষ অন্য জীবন”। ১০ জুলাই ২০০২ মঞ্চস্থ হয় নূরে আলম সিদ্দিকী রচিত ও এম. এ. বাশার নির্দেশিত নাটক “মন্টু মিয়ার আষাঢ়ে গল্প”। ১৬ জানুয়ারি ২০০৩ সন্ধ্যা ৬.৩০-য়ে রংপুর টাউন হলে এম. এ. বাশারের ছোটগল্প অবলম্বনে ও সাঈদ সাহেদুল ইসলামের নাট্যরূপ ও নির্দেশনায় নাটক “চ্যাপ্টী” মঞ্চস্থ হয়। বাংলা নববর্ষ উদযাপন উপলক্ষ্যে সাঈদ সাহেদুল ইসলামের রচনা ও নির্দেশনায় নাটিকা ‘সকিমনের বৈশাখ’ ১৪ এপ্রিল ২০০৪ রংপুর শহীদ মিনারে মঞ্চস্থ হয়। ২০১৮ তম সাপ্তাহিক সাহিত্য আসার উদযাপন ও ৪০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ১২ মে ২০১৭ দিনব্যাপী রংপুরে প্রথম লিটলম্যাগ উৎসব ও প্রদর্শনী এবং সন্ধ্যায় সাঈদ সাহেদুল ইসলাম এর কাব্যনাট্য ‘আজ আমাদের আনন্দধারা’ মঞ্চস্থ হয়।
সংগীত ও অঙ্কনেও ২০০১ সালে অভিযাত্রিকের সংগীত বিভাগটি নতুন আঙ্গিকে চালু হয়। অনেক প্রবীণ শিল্পী এতে নিয়মিত অংশ নেয়। শিশুদের মননবিকাশে অভিযাত্রিক অঙ্কন বিভাগ চালুর উদ্যোগ গ্রহণ করে।
আবৃত্তিতে শুদ্ধ উচ্চারণ সুন্দর করে কথা বলা এবং উপস্থাপনার জন্য আবৃত্তি অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। অভিযাত্রিক সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই অধ্যপক মোহাম্মদ শাহ আলমের প্রচেষ্টায় চালু হয় আবৃত্তি প্রশিক্ষণ কোর্স। এখান থেকে অনেক আবৃত্তিকার সৃষ্টি হয়েছে, সৃষ্টি হয়েছে অনেক উপস্থাপকও। অভিযাত্রিক সাহিত্য ও সংস্কৃতি সংসদ প্রতি বৎসর বার্ষিক বনভোজনের আয়োজন করে থাকে। বিভিন্ন কবি সাহিত্যিকদের জন্মস্থান, ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানসমূহকে বনভোজনের স্থান হিসেবে নির্ধারণ করা হয়।
অভিযাত্রিক সাহিত্য ও সংস্কৃতি সংসদ সাহিত্য ও সংস্কৃতিচর্চার পাশাপাশি জনকল্যাণমূলক কর্মকান্ডে অংশ গ্রহণ করে থাকে। উত্তরাঞ্চলের শীতার্ত মানুষদের কাছে প্রতি বছর অভিযাত্রিক শীতবস্ত্র বিতরণ ও বন্যা কবলিত মানুষদের মাঝে প্রয়োজনীয় উপকরণ ও খাদ্যদ্রব্য বিতরণ করে।